User login
Sing In with your email
Send
Our Price:
Regular Price:
Shipping:Tk. 50
প্রিয় ,
সেদিন আপনার কার্টে কিছু বই রেখে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন।
মিলিয়ে দেখুন তো বইগুলো ঠিক আছে কিনা?
Share your query and ideas with us!
Was this review helpful to you?
or
I love the author's writing style. Especially, the "চিলেকোঠার সেপাই" made a place for itself in my mind. But unfortunately, I totally forgot what this book was about. Maybe it didn't catch my attention as much as the other book did. But I can assure you the author's storytelling should give you a pleasant experience. Thank you.
Was this review helpful to you?
or
ইলিয়াসের অন্য এক গল্প, ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ইলিয়াস ঢাকা শহরেরএকেবারে হত দরিদ্র মানুষকে চিনতেন। তাদের কথা নিয়েই ‘চিলে কোঠার সেপাই’ লিখেছিলেন। সেই রিকশাওয়ালা খিজির, বাংলা সাহিত্য কি তাকে ভুলবে? তেমনি এক চরিত্র ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ গল্পের লালমিয়া। সে যে খোয়াব দ্যাখে ঘুমের ভিতর তা সাত কাহন করে শোনায়। আসলে খোয়াব দ্যাখে না খোয়াব বানায় তার ঠিক নেই। তার স্বপ্নগুলি জাল ( মিথ্যা), না সে স্বপ্নের জালে ক্রমাগত জড়িয়ে যায়, এই নিয়ে গল্প। লালমিয়ার যে খোয়াবে আরম্ভ হয় গল্প, সেই খোয়াবের বুড়ো মুসল্লির পায়ের পাতাটি পিছনে। তা নিয়ে শ্রোতারা সন্দেহ প্রকাশ করলেও লালমিয়া তার বয়ান থেকে পিছু হটে না। স্বপ্নের ভিতরে নামাজ পড়তে পড়তে তার পাশে বসা বুড়োর পায়ের পাতাটি সে অমনি দেখেছিল। এই কাহিনী, পায়ের পাতা উলটো করে বসান বিদেহী, লোকসমাজে প্রচলিত। আমি তো ছেলেবেলায় তা শুনেছি। লালমিয়া নাজির আলির মোরগা-পোলাওয়ের দোকান দ্যাখে। সেই দোকানেই কাজ করে যে কিশোর বুলেট, সে লালমিয়ার স্যাঙাৎ ইমামুদ্দিনের ছেলে। ইমামুদিন মুক্তিতে নাম লিখিয়েছিল, তাই মরেছে। তার বউকে মিলিটারি তুলে নিয়ে গিয়েছিল, আর ফেরত দেয়নি। বুলেট তার দাদির কাছে মানুষ। তার স্বভাবটি হয়েছে তার বাবা ইমামুদ্দিনের মতো। লালমিয়ার কথায় শুধু সন্দেহ প্রকাশ করে। এই গল্প সেই ইমামুদ্দিনেরও যে কিনা মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে আহুতি দিয়েছিল। এই কাহিনী নাজির আলির যে কিনা পাকিস্তানি মিলিটারির খিদমৎ খাটত। মিলিটারিকে জানান দিত মুক্তির পক্ষের লোকজনের সুলুক।ইলিয়াস নগরবাসী নিম্নবর্গের মানুষকে চিনতেন যেভাবে, সেই চেনা আমাদের সাহিত্যে, দুই বাংলাতেই বিরল। লালমিয়া ছিল নাজির আলির কর্মচারি। লালমিয়া মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। কিন্তু লালমিয়া ইমামুদ্দিনের এতিম বাচ্চা আর তার মায়ের জন্য আহার জোগাড় করেছিল। তার জীবনের অন্তর্গত হয়েই আসে এই সব। সে নাজির আলি নয়, সে লালমিয়া। সে যাদের দ্যাখে খোয়াবে, তাদের পায়ের পাতা পিছনে। তারা সমুখে এগোতে গেলে পিছনে চলে যায়। পিছনে হাঁটা ব্যতীত তাদের কোনো উপায় থাকে না, তাই খোয়াব তাকে ভয়ার্ত করেনি। এই গল্প এক আশ্চর্য কথন। ইলিয়াস নিজেই নিজের সঙ্গে তুলনীয়।
Was this review helpful to you?
or
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একজন স্বল্পপ্রজ লেখক ছিলেন। দুইটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন এই নিয়ে তাঁর রচনাসম্ভার । কোন কোন লেখকের প্রতিটি রচনাই সাহিত্যের জন্য ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় এমন লেখকই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস । বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তাঁর রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা। লেখকের সুস্পষ্ট ও সহজ সরল ভাষায় বর্ণনার কারণে পাঠকের কাছে সহজেই বাস্তব হয়ে ধরা পড়ে প্রতিটি গল্প । সমাজের অগ্রহনযোগ্য বিষয়গুলোকে আড়াল করে তথাকথিত সপরিবারে পাঠযোগ্য গল্প-গাথা বা পলব কাহিনী রচনায় আক্তারুজ্জামান কখনই আগ্রহী হন নি। আমাদের চারপাশের বহমান জীবন, আর চেনা বাস্তবের কথাই তিনি লিখেছেন। এই বাস্তব সম্পর্কে আমরা হয়তো তেমন সচেতন নই। ইলিয়াসের লেখা পড়েই এ ব্যাপারে আমাদের বোধদয় ঘটে। তাঁর চোখ দিয়ে আবার নতুন করে এর সঙ্গে পরিচিত হই, একে চিনতে পারি। আর এটা তো কালজয়ী রচনারই একটা বৈশিষ্ট্য। নিপুণ বাস্তব চিত্রণের পাশাপাশি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ ইলিয়াসের রচনাকে অপূর্ব শিল্প-সুষমা দান করেছে। প্রথম গল্প 'প্রেমের গপ্পো'।এ গল্পটিকে গল্প কম প্রেমের কথোপকথন বেশি বলা যায়।বুলা এবং জাহাঙ্গীর নবদম্পতি।এই দম্পতির কথোপকথনে প্রকাশ পায় তাদের জীবনে পাওয়া না পাওয়া এর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রেমের ঘটনা। অতিসাধারণ সংলাপ ও কাহিনী সুধুমাত্র লেখকের লেখনীর কারনে হয়ে উঠেছে অসাধারন। দ্বিতীয় গল্প ‘ফোঁড়া’।আমাদের পুঁজে ভরা নিম্নবিত্ত সমাজের নোংরামি,কদর্যতার মাত্রা লেখক প্রকাশ করেছেন ফোঁড়া গল্পটির মাধ্যমে। এক রিকশাওয়ালার পুরুষাঙ্গের এক ফোঁড়া কে রুপক অর্থে বুঝিয়েছেন লেখক।যেখানে লেখক ফোঁড়া নিরাময় করেননি। ফোঁড়ার চারপাশ টিপে টিপে পুঁজ বের করাকে সমাজের পুজগ্রস্ত অংশকে বের করে দেয়ার ভাব ব্যাক্ত করেছেন। এরপরের গল্প শিরোনাম গল্প ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ ।মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত গল্প। মুক্তিযুদ্ধের ও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ তুলে ধরেছেন লেখক।সেই সাথে আরও তুলে ধরেছেন মানুষের অদ্ভুত মনস্তাতিকতা। স্বাধীনতা বিরোধী নাজির আলীর সম্পত্তি ভোগ করে মুক্তিযোদ্ধা।বন্ধু ইমামুদ্দিনের ছেলে বুলে্টকে কর্মচারী রাখে।আবার উল্টা পায়ের জীনের স্বপ্ন দেখে বুলেট।উলটানো পায়ের পাতা ওয়ালাদের অদৃশ্য আখড়ায় হারিয়ে যাবার স্বপ্ন আমাদের আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস যোগায়।মানসিক শক্তি যোগায়। চতুর্থ গল্প ‘কান্না’ ।এটি একটি মনস্তাতিক গল্প।আফাজ আলীর পেশা টাকার বদলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পরা।তাদের জন্যে চোখের পানিও ফেলেন আফাজ আলী। এটাই তার জিবিকা।কিন্তু নিজের পুত্র হাবিবুল্লাহর মৃত্যুতে তার চোখের পানি ভিজিয়ে দেয় আল্লার নাম আর মুছে ফেলার যোগাড় করে আল্লার অস্তিত্বকে। সর্বশেষ গল্প ‘রেইনকোট’। এ গল্পটিও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। তৎকালীন ঘোরলাগা সময়ে ভিতু অথবা সাহসী মানুষ এর ঘোরলাগা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত সমূহের কাহিনী ফুটে উঠেছে গল্পে। জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ বইয়ে উঠে এসেছে সমাজের সুখ দুঃখ নীচুতা সামাজিকতা সব কিছুই । তাই বলব পড়ে দেখুন ।।
Was this review helpful to you?
or
মাত্র ২৮টা ছোটগল্প লিখেও অনেকের কাছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রতিপন্ন হন রবীন্দ্র পরবর্তি যুগে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা ছোট গল্পকার হিসেবে। সত্তরের দশকে বাংলা সাহিত্যের বাগানে প্রবেশ করেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিম-মানিক-শরৎচন্দ্র-যাযাবর এমন অনেকের চেষ্টার ফসলে গড়ে ওঠা সাজানো বাগানকে এতটুকু নোংরা করেননি ইলিয়াস। বরং আপন স্বকীয়তায় মূলত নতুন ধারার ছোটগল্প লিখে বাংলা সাহিত্যের বাগানকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। আজ তাই বাংলা সাহিত্যের সেই বাগানে গুটিকয়েক ছোটগল্পের মালি হয়েও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। আর তার সেই ছোটগল্পের ছোট্ট কিন্তু বৈচিত্র্যময় সম্ভার হতে ৫টি আলাদা ধারা, আলাদা মেজাজ, আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি, আলাদা বিষয় আর আলাদা কাহিনীর গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে “জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল” বইটি। প্রতিটি গল্পই সাক্ষ্য দেয় ছোটগল্পকার হিসেবে ইলিয়াসের শ্রেষ্ঠত্বের। ইলিয়াস হলেন সেই সাহসী লেখক যিনি গল্প বলার সময় কোন সীমা মানেননি। নিজের লেখাকেই চরম মাত্রা ধরে নিয়ে তিনি সবই লিখে গেছেন গল্পের প্রয়োজনে। আর তাইতো তার গল্পের চরিত্ররা যত অশ্রাব্য ভাষায়ই কথা বলুক না কেন; তার গল্পকে 'অশ্লীল সাহিত্য' বলা যায় না, বলতে হয় 'সাহিত্যের অশ্লীলতা'। 'প্রেমের গপ্পো'তে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে করে চলে প্রেমের গপ্পো। পড়ে মনেই হবে না, এটা কোন গল্প। মনে হবে, এটা হয়ত কোন স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আলাপচারিতার ধারাভাষ্য। ইলিয়াসের লেখা আসলে এমনই। এতটাই সহজ ভাষায় লিখে পাঠককে পৌঁছে দেন চরিত্রগুলোর গভীরে যে তাদের কথাবার্তা আর অপরাপর সাহিত্যের সংলাপের মত ফিল্মি ঠেকে না। এই গল্পেও বুলা আর জাহাঙ্গীরের কথোপকথন বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। জাহাঙ্গীরের মুখে তার প্রেমের গল্প আর সেই কথার পিঠে বুলার কিছু মন্তব্যের মাধ্যমে গোটা গল্পের কাহিনী আপন গতিতে এগিয়ে যায়। একই সমান্তরালে বুলা আর জাহাঙ্গীরের প্রেমও জমতে শুরু করে। ক্রমেই গল্পের কাহিনীও ঘনীভূত হতে থাকে। জাহাঙ্গীরের চরিত্র একটা ছাঁচে পড়ে আপনমূর্তি ধারণ করে। বুলার চরিত্রও তার নিজের স্মৃতি, বিস্মৃতি আর আবেগের ফাঁদে পড়ে বিশিষ্টতা অর্জন করে। 'ফোঁড়া' গল্পটিতে ইলিয়াস ফোঁড়া সারিয়ে তোলার কোন চেষ্টাও করেননি। দুর্ভাগা রিকশাওয়ালা যেমন নিজের ফোঁড়ার চারদিক টিপে পুঁজ বের করেছে, তেমনি লেখকও আমাদের সমাজের আপাত ফোঁড়া হিসেবে গণ্য হওয়া কিছু বিষয়ের গভীরে গিয়ে, সেগুলোর ভেতর থেকে গলে যাওয়া, পচে যাওয়া পুঁজ বের করে পাঠককে বুঝিয়েছেন সেগুলোর ভয়াবহতার তীব্রতা, দুর্গন্ধের মাত্রা। নিম্নবিত্তের জীবনমুখী এই গল্প অনেকক্ষণ ভাবাবে পাঠককে। আর লেখকের অনন্য শব্দচয়নে গল্পটি লাভ করেছে অসাধারনত্ব। কিন্তু ইলিয়াসের অন্যান্য গল্পের মত এটিও 'ছোটদের পড়া বারণ'! 'জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল' নামক গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, অস্বাভাবিক মনস্তত্বের কিছু অতি স্বাভাবিক মানুষের চারিত্রিক বহিঃপ্রকাশ নজর কাড়বে। পাঠকের মনোজগতেও ঝড় তুলবে। উপমা ও দৃশ্যকল্পের কিছু বর্ণনা চমকে দেবে সবাইকে, সেই সাথে স্বপ্ন দেখতেও শেখাবে। 'কান্না' আগের গল্পগুলোর মতই অনন্য ও অভিনব বিষয়বস্তুতে গড়ে ওঠা এক কাহিনী। আফাজ আলীর চোখের পানি যে আসলে কার জন্য, কোথা থেকে কি কারণে এই পানির আগমন সব প্রশ্নকে পাশে ফেলে শুধু দেখে যেতে হবে, কিভাবে সেই চোখের পানি মুছে দেয় পার্থিবতা-অপার্থিবতার সকল দোলাচলকে। এই গল্পটিও যতটা না বর্ননাত্মক তারচেয়ে বেশি সাইকোলজিকাল। কিন্তু সেখানেও লেখকের সুতীক্ষ্ণ বর্ণনা গল্পের গভীরে নিয়ে ছেড়ে দেবে পাঠককে। সেই গভীরতা ভেদ করে পরের গল্পে যাওয়া একটু কঠিনই হবে! 'রেইনকোট' গল্পটিও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের। এটির অসাধারনত্ব এই কারণে যে, এখানে শুধু একাত্তরের চিত্রকল্পই ফুটে ওঠেনি। গল্পের প্রতিটা বাক্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানুষের ঘোরলাগা চিন্তাশক্তি। এক ভীষণ বিষয়বস্তুকে পুঁজি করে এগিয়ে চলা কাহিনী আর তার পরিণতি আরও একবার পাঠককে বাধ্য করবে একাত্তরকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে। শেষকথা বলে আর কিছু নেই। থাকতে পারেও না। শুধু এই পাঁচটি গল্পই নয়। পড়া দরকার ইলিয়াসের বাকি গল্পগুলোও। তা না হলে আপনার মনোজগৎ বঞ্চিত হবে ইলিয়াসের গড়ে তোলা জাদুকরী, ভ্রমে ভরা দৃশ্যপটে প্রবেশের সুযোগ হতে। আর বিশেষ করে স্বপ্নের জালে জড়িয়ে পড়তে চাইলে এই গল্পগ্রন্থের স্বাদ নিতেই হবে! বইটি যখন পড়া শেষ হবে, তখন এই বই পাঠের অভিজ্ঞতা নিশ্চিতভাবেই আপনার কাছে বিবেচিত হবে 'স্বপ্নের জালে জড়িয়ে পড়ার ভ্রমণ' হিসেবে।
Was this review helpful to you?
or
সমাজের দগদগে ঘা, পুঁজ-রক্তকে আড়াল ক’রে তথাকথিত সপরিবারে পাঠযোগ্য গল্প-গাথা বা পলব কাহিনী রচনায় আক্তারুজ্জামান কখনই আগ্রহী হন নি। আমাদের চারপাশের বহমান জীবন, আর চেনা বাস্তবের কথাই তিনি লিখেছেন। এই বাস্তব সম্পর্কে আমরা হয়তো তেমন সচেতন নই। ইলিয়াসের লেখা পড়েই এ ব্যাপারে আমাদের বোধদয় ঘটে। তাঁর চোখ দিয়ে আবার নতুন করে এর সঙ্গে পরিচিত হই, একে চিনতে পারি। আর এটা তো কালজয়ী রচনারই একটা বৈশিষ্ট্য। নিপুণ বাস্তব চিত্রণের পাশাপাশি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ ইলিয়াসের রচনাকে অপূর্ব শিল্প-সুষমা দান করেছে। সহজ জনপ্রিয়তার পথটিকে প্রথম থেকে সযত্নে পরিহার ক’রেও তাই তিনি পাঠকপ্রিয় লেখক। যে- কোনো মনোযোগী পাঠকের কাছেই সমাদৃত। এ যুগেও ইতিহাসের বিশাল পটভূমিতে উপন্যাস রচনার কথা তিনিই ভাবতে পারেন। তাঁর ছোট গল্পেও ডিটেইলের ব্যাপক ব্যবহার আমাদের বিস্ময়-বিমুগ্ধ করে। ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’-এ ইলিয়াসের ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যগুলি যেন আরো দীপ্তিমান। সেই সঙ্গে এক গভীর মানবিকতাবোধ সংকলনের গল্পগুলিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
Was this review helpful to you?
or
ইলিয়াস আমাদের কাছে খুব বেশি মালমশলা রেখে যান নাই, মাত্র ২৮ টা গল্প, অল্প কিছু প্রবন্ধ আর ২ টি উপন্যাস, সাকুল্যে এই আমাদের সম্পদ। কিন্তু অল্প সংখ্যক লেখা দিয়াই তিনি নিজের স্টাইল দাঁড় করে ফেলেছেন। যে কারণে ইলিয়াসের লেখা পড়েই আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না এটা কার লেখা। তো কি সেই স্টাইল? আমি জেনারালাইজড করতে পারছি না। তবে নিজের পাঠানুভুতি বলতে পারি। ইলিয়াসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ লাগে বর্ণনা। আমি নিজে বর্ণনার খুব ভক্ত। গল্প যখন মাথার ভেতর সিনেমা হয়ে ওঠে, সেই মুহুর্তেই আমার গল্পরে ভালবাসতে ইচ্ছা করে। তার আগ পর্যন্ত দুরে ঠেলে বসিয়ে রাখি। ইলিয়াসের গল্পগুলান এই দিক দিয়ে একদম যা-তা রকমের ভাল। বর্ণনাগুলা এত সাবলীল যে মাত্র অল্প কিছু লাইনের পরেই মাথার ভেতরে গল্পের দৃশ্যগুলার চিত্রায়ন করে নিতে কোনরূপ সমস্যা হয় না। তারপরে ক্রমশ সেটা ফেনায়িত হতে থাকে, গরম কফির মত। তখন খানিকটা নেশাও লেগে যায়, বর্ণনার গুণেই। ইলিয়াস পড়তে গিয়া আমি যে সমস্যায় পড়েছি, সেটা সাধারণত অমনোযোগী/ নতুন পাঠকদের বেলায় ঘটে। কিন্তু আমি মনোযোগী পাঠক, তবু এই সমস্যার কারণ ধরতে পারি নাই বলে দোষটা ইলিয়াসের গদ্যের উপরই চাপিয়ে দিতে দ্বিধা করি নাই। সমস্যাটা হলো- বর্ণনার এই অস্বাভাবিক গুণের কারণেই মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। দৃশ্য বা দৃশ্যচিত্রে এমন করে ডুবে যেতে হয় যে, গল্প থেকে সরে যাই মাঝে মাঝে, ছবিটাই মাথা জুড়ে আসন গাড়ে। তখন খানিকটা গা ঝাড়া দিয়ে মনে করে নিতে হয়- গল্পটা আসলে এই ছিলো! * প্রেমের গপ্পো- আমি বলবো- ইলিয়াসের অন্যগুলার চেয়ে একটু আলাদা। ভাষা একদম সহজ সরল, ইলিয়াসের অন্যগুলোর তুলনায়। ইলিয়াস যেটা করেন, চরিত্রগুলার চিন্তা-চেতনারে সাথে নিয়ে গল্প এগুতে থাকেন। অনেকে এই ক্ষেত্রে স্বগতোক্তি ব্যবহার করেন, কিন্তু ইলিয়াস সেইটার ধার ধারেন না। উনি নিজেই চরিত্রের মনের কথা, অলমোষ্ট, চরিত্রের ভাষায়ই গল্পে তুইলা আনেন। সংলাপ গুলায় কোন অবাস্তবতা নাই। নতুন বিয়ার পরে স্বামী-স্ত্রী যেভাবে আলাপ করে, ঠিক সেই সুরে পুরা গল্পের সংলাপ আর বয়ান এগিয়ে যায়, কোন ছন্দপতন ছাড়াই। একটা সংলাপ যেমন, " আমার থ্রো দেখে বলে, আপনার হাতের মুভমেন্ট খুব ম্যাজেস্টিক, আবার খুব ফাস্ট।"- এইখানে আমরা হয়তো ইংরেজি শবদগুলারে ঠিক এইভাবে লিখতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম, কিন্তু তাহলে যেটা হইতো, এইটা ঠিক রিয়েল হয়ে উঠতো না। আবার যদি শুধু সংলাপে এইরকম সাবলীলতা রাইখা বর্ণনায় বিশুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করতেন, তাহলে হয়তো বাংলা গল্প লেখার নিয়ম মানা হইতো, শুদ্ধ গল্প লেখা হইতো, কিন্তু আবারো সেইটা রিয়েলিটি থেকে সরে যেত। যেমন এইখানে- বুলা ফের হাসে, 'আবার ঢাকাইয়া ল্যাংগুয়েজ।' কিন্তু জাহাংগীরের তখন ফ্লো এসে গেছে। ' এক্কেরে লাইন। বনানী, গুলশান...' এই যে বর্ণনাতেও গল্পের চরিত্রগুলার মতনই কথা ব্যবহার করা, এইটাই আমার কাছে ভাল লাগলো। ইলিয়াসের অন্য গল্পগুলার মতন, এই গল্পটাও পড়ার পর মনে হইলো, যেন একটা সংগীতসন্ধ্যার শুরুতে কোন একজন ওস্তাদ তার যন্ত্রপাতি গুলা টিউন করে রাখছেন, তারপর সেই সুরেই পুরো বাজনা বাজাইলেন। কোথাও সুর কাটে নাই। * এই গল্প নিয়া আলাপ করতে গিয়ে (আনোয়ার সাদাত) শিমুল একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, হাসপাতাল ও তার পরবর্তী বিশ্লেষণের স্পষ্টতা কী? আমি মনে করি, সুনীলদাকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলা আসলে জাহাংগীরের চরিত্র নির্মাণের জন্যেই দরকার ছিলো। জাহাংগীর আসলে কেমন মানুষ। আপাতত সৎ, এবং একটু সহজ সরল মানুষ। জীবনের খুব বেশি উন্নতি করতে পারে নাই, এখনো স্ট্রাগলিং। এই ধরণের মানুষগুলা খুব বেশি কল্পনা বিলাসে ভোগে আসলে। তারা বাস্তবে যা পারে নাই, কল্পনায় সেটা অধিকার বা দখল করার চেষ্টা করে। এ কারণেই, চাকরিতে সমস্যার পরেও জাহাংগীরের এটা ভেবে নিতে ভাল লাগে, অফিসে সবাই তারে খুব সম্মান করে। কলেজ জীবনে কোন মেয়ের সাথে কখনোই কথা বলে নাই। এই অতৃপ্তিটা পোষানোর জন্যে তার কাছে আসলে কল্পনার আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোন গতি থাকে না। সে তাই কোন এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা মাত্র এক লাইন শুনেই শাহীন বা শাহনাজের পুরো চরিত্র দাঁড় করে ফেলে। যেখানে সে নিজেই হিরো। কল্পনা বিলাসী মানুষ এই রকম কল্পনাগুলা নিজে খুব বিশ্বাস করে, এবং এই বিশ্বাসটাকে ভিত্তি দেবার জন্যে যাদের সাথে ঐ ঘটনার কোন যোগ নাই, তাদের কাছে সত্যের মত করেই গল্প করে। হিপ হিপ হুররে-র প্রসঙ্গে তার ভাবনা-চিন্তাগুলো এরকম হবার কারণও এই। সুনীলদার হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন মুশতাক আর বুলা কান্না করে, তখন জাহাংগীরের একটা ঈর্ষা হয়, সে টের পায়, ও ঠিক বুলা-মুশতাকের লেভেলের মানুষ না। বুলা-মুশতাক কোন লেভেলের? যে লেভেলে যাবার কল্পনা সে করে। কিন্তু বাস্তবে পারে নাই। এই কারণেই বুলা-মুশতাক যখন একসাথে কান্নাকাটি করে, তখন জাহাংগীর নিজের ভেতরে টের পায়, কারো সাথে আসলে স্মৃতি নিয়া তার কোন ভাগাভাগি নাই। কল্পনায় সে নিজেই নিজের নায়ক, ঐখানে নানা মেয়ে তাকে প্রস্তাব দেয়, ওইখানে সে হিরোর মতন সবাইকে রক্ষা করে, কিন্তু বাস্তবে সে আসলে বড় একা। এই সুখকল্পনাগুলা একান্তই তার নিজের, একার। একজন আধা-সফল ( প্রকারন্তরে আধা-ব্যার্থ ) মানুষের চরিত্রের একটা পার্ফেক্ট ছবি হলো এই জাহাংগীর। * ইলিয়াসের এই গল্পটা তাই আমার খুব প্রিয় গল্প। পড়ার পরেই আমার মনে হয়েছিলো, আরেসশালা! কেউ কইবো এইটা ইলিয়াসের গল্প? কিন্তু, তারপরেই মনে হইছে, এই কারুকার্যময় গল্পটা পড়ার পরে যে কেউই বুঝে যাবে- এই গল্প কেবল ইলিয়াসেরই!
Was this review helpful to you?
or
শতবছরে বাংলা সাহিত্যের রাবীন্দ্রিক ফসল ছোটগল্পের বহুমাত্রিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ছোটগল্পের মাধ্যমে সত্তর দশকে বাংলা সাহিত্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুপ্রবেশ ঘটে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের। নিরাসক্ত বর্ণনা, বর্ণনার ডিটেইল, ডিটেইলের গভীরতা-ইলিয়াসের গল্পকে কল্প নয় বরং গল্প-এ ঠাঁই করে দেয় অনাহাসে। লেখকের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মাওলা ব্রাদার্স থেকে ৫টি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় “জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল” বইটি। ‘প্রেমের গপ্পো’ নামের প্রথম গল্পে নবদম্পতি বুলা আর জাহাঙ্গীরের কথোপকথনের বর্ণনায় উঠে আসে ফেলে আসা প্রেম কিংবা না-প্রেম এর দোলাচলে কেটে যাওয়া কিছু সময়ের স্মৃতি বা বিস্মৃতি। স্বামীর যৌবনের প্রেমের গল্পে অসংগতি ধরে হেসে উঠা বুলাকে গভীর ভালোবাসায় অনুভব করতে শুরু করে জাহাঙ্গীর। শাহীন কিংবা শাহনাজ যে নামেই হোক না কেন জাহাঙ্গীর অবলীলায় বলে চলে ফেলে আসা প্রেম-প্রেম গপ্পো কিন্তু এতোকালের শ্রদ্ধেয় গানের গুরু সুনীল দা’র প্রতি বুলার শেষ অনুভবের জায়গাটুকুতে হঠাৎ যেন হোঁচট খেতে হয় আপাতত সৎ, আপেক্ষিক সরল আর জীবনের মহাযুদ্ধে স্ট্রাগলিং করা জাহাঙ্গীরকে। কিন্তু গল্পের শেষে ভেসপার চাকা ঘুরে জাহাঙ্গীরকে ফিরে আসতে হয় সময়ের পথে জানা হয়তোবা অজানার পথে। নিদারুণ পক্ষপাতিত্বহীন সংলাপ আর স্মৃতি-বিস্মৃতির ছোঁয়াছুয়ি খেলায় অতিসাধারণ গল্পকে লেখক তুলে ধরেছেন অনন্যসাধারণ করে। রাজনৈতিক খেলার বলি নইমুদ্দিনদের পুঁজে ভেসে যাওয়া নিম্নবিত্তের সমাজ আর জীবনের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণী কথা তুলে ধরা হয়েছে দ্বিতীয় গল্প ‘ফোঁড়া’-তে। ধমক খাবার পরও রিক্সাওয়ালার তেজস্বী উচ্চারণ, “......এই শালার চুতমারানির ফোঁড়া, শালার হামি গোয়া মারি” যেন মামুনদের নিপুণ গালে অসংখ্য চপটেঘাত। কেবল রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা নয় লেখকের স্ল্যাং ভাষাও যে কতোটা শৈল্পিক হতে পারে তারই এক উদাহরণ ‘ফোঁড়া’। পড়ে যাওয়া রিক্সাওয়ালার নুনু ও বিচির দিকে চোখ পড়া মামুনের পাঁচ টাকার নোট ছুঁড়ে দেয়া পাঠককে তাড়িত করে কিন্তু ছুঁড়ে দেয়া টাকার প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন রিক্সাওয়ালার ফোঁড়ার চারদিকে টিপে পুঁজ বের করার চিত্র পাঠককে আক্রান্ত করে। শিরোনাম গল্প ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ পাঠককে আচ্ছন্ন করে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আর স্বপ্ন দেখায় চলমান সময়ের স্বাপ্নিক জালে। শুধুমাত্র অল্প কয়েকটি চরিত্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ গল্পে ইলিয়াস মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সময়ের স্বপ্নভঙ্গ আর স্বপ্নকথার বয়ান করেছেন নির্মোহ ও সামগ্রিক ফ্রেমে। নাজির আলীর বাঙ্গালী বিরোধিতা কিংবা লালমিয়ার পাকিস্তান প্রীতি এবং পরবর্তীতে নাজির আলীর সম্পত্তি ভোগ করে মুক্তিযোদ্ধা ও বন্ধু ইমামুদ্দিনের ছেলে বুলে্টকে কর্মচারী রাখা ইত্যাদি কোন কিছুতেই যেন খটকা খেতে হয় না পাঠককে। কিন্তু উল্টা পায়ের জীনের স্বপ্ন পাঠককে কেবল খটকা নয় বরং অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। বুলেটের পেচ্ছাবের তোড়ে পিছিয়ে যাওয়া উলটানো পায়ের পাতা ওয়ালাদের অদৃশ্য আখড়ায় হারিয়ে যাবার স্বপ্ন আমাদের স্বপ্ন দেখায়, স্বপ্ন বোনার সাহস যোগায়। চতুর্থ গল্প ‘কান্না’ বাংলা সাহিত্যের বিরলতম ব্যক্তিক, মনোবৈশ্লেষিক কিন্তু একই সাথে আশ্চর্যজনক ভাবে কর্পোরেট জগতের বাঁকা চাহনীর নির্মম আখ্যান। সারাজীবন জীবিকার তাগিদে কবরস্থানে কাটানো আফাজ আলী টাকার বদলে কেবল জীবিতদের হয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পড়েন না, তাদের জন্য চোখের পানিও ফেলেন। চোখের পানি বিকিয়ে চলা আফাজ আলীর পুত্র হাবিবুল্লাহর মৃত্যুতে তার চোখের পানি চপচপ ভিজিয়ে দেয় আল্লার নাম আর মুছে ফেলার যোগাড় করে আল্লার অস্তিত্বকে। গল্পের অভিনব বিষয়বস্তু আর তীক্ষ্ণ বর্ণনায় আফাজ আলীর চোখের পানি সিক্ত করে পাঠকের মনন আর অস্তিত্বকে। সর্বশেষ গল্প ‘রেইনকোট’ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের একরোখা, গভীর এবং তীব্র জলছবি। একজন আপাত ভয়কাতুরে অথবা কয়েকজন সাহসী কিংবা ঘোরলাগা সময়ের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত সমূহের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে গল্পের কাহিনী। পালিয়ে থাকা মিসক্রিয়েন্ট শালার রেইনকোট গায়ে দেয়া, মিসক্রিয়েন্টদের সাথে আঁতাত ও তাদের সাথে আঁতাত রাখার উত্তেজনায় কেঁপে উঠা নুরুল হুদার ঝুলন্ত শরীরে চাঁবুকের বাড়ি আমাদের কাঁপিয়ে দেয় কিন্তু নিস্পৃহ রাখে ৭১-র নুরুল হুদাদের। ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ বইয়ে ইলিয়াস পাঠককে নিয়ে যায় মাছ-জল ভালোবাসায়, শকুন-সামাজিকতায়, পিপীলিকা-শোকে আর প্রজাপতি-দিনে। প্রতিটি গল্পের গল্পে পাঠক খুঁজে পায় এক একটি স্বাস্থ্যবান ও বলশালী দেবদূত, শয়তান কিংবা উভয়প্রকাশ, জীবনের শৈল্পিক অশ্লীল খিস্তিখেউর এবং দুঃখ, শোক, আনন্দের নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান।
Was this review helpful to you?
or
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর জ্বাল স্বপ্ন,স্বপ্নের জ্বাল বইটিতে ছোটগল্প গুলো এক গভীর মানবিকতার বৈশিষ্টে দীপ্তিমান।সমাজের অশ্লীলতা ,নোংরামি, কদর্যতাকে তিনি তার লেখা থেকে আলাদা করেন নি লেখাকে পরিশীলিত ও সমাজের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্যে।এসব কে প্রামান্য ধরেই তিনি লিখে গেছেন তার লেখা।তাই তার প্রতিটি লেখাই পাঠকের কাছে প্রকাশিত হয় এক নতুন অভিজ্ঞতা,বোধের জগতে এক নতুন মাইলফলক হিসাবে।এবং এর ব্যাতিক্রম নয় জ্বাল স্বপ্ন,স্বপ্নের জ্বাল গল্পগ্রন্থটি। প্রথম গল্প 'প্রেমের গপ্পো'।এ গল্পটিকে গল্প কম প্রেমের কথোপকথন বেশি বলা যায়।বুলা এবং জাহাঙ্গীর নবদম্পতি।এই দম্পতির কথোপকথনে প্রকাশ পায় তাদের জীবনে পাওয়া না পাওয়া এর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রেমের ঘটনা। অতিসাধারণ সংলাপ ও কাহিনী সুধুমাত্র লেখকের লেখনীর কারনে হয়ে উঠেছে অসাধারন। দ্বিতীয় গল্প ‘ফোঁড়া’।আমাদের পুঁজে ভরা নিম্নবিত্ত সমাজের নোংরামি,কদর্যতার মাত্রা লেখক প্রকাশ করেছেন ফোঁড়া গল্পটির মাধ্যমে। এক রিকশাওয়ালার পুরুষাঙ্গের এক ফোঁড়া কে রুপক অর্থে বুঝিয়েছেন লেখক।যেখানে লেখক ফোঁড়া নিরাময় করেননি। ফোঁড়ার চারপাশ টিপে টিপে পুঁজ বের করাকে সমাজের পুজগ্রস্ত অংশকে বের করে দেয়ার ভাব ব্যাক্ত করেছেন। এরপরের গল্প শিরোনাম গল্প ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ ।মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত গল্প। মুক্তিযুদ্ধের ও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ তুলে ধরেছেন লেখক।সেই সাথে আরও তুলে ধরেছেন মানুষের অদ্ভুত মনস্তাতিকতা। স্বাধীনতা বিরোধী নাজির আলীর সম্পত্তি ভোগ করে মুক্তিযোদ্ধা।বন্ধু ইমামুদ্দিনের ছেলে বুলে্টকে কর্মচারী রাখে।আবার উল্টা পায়ের জীনের স্বপ্ন দেখে বুলেট।উলটানো পায়ের পাতা ওয়ালাদের অদৃশ্য আখড়ায় হারিয়ে যাবার স্বপ্ন আমাদের আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস যোগায়।মানসিক শক্তি যোগায়। চতুর্থ গল্প ‘কান্না’ ।এটি একটি মনস্তাতিক গল্প।আফাজ আলীর পেশা টাকার বদলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পরা।তাদের জন্যে চোখের পানিও ফেলেন আফাজ আলী। এটাই তার জিবিকা।কিন্তু নিজের পুত্র হাবিবুল্লাহর মৃত্যুতে তার চোখের পানি ভিজিয়ে দেয় আল্লার নাম আর মুছে ফেলার যোগাড় করে আল্লার অস্তিত্বকে। সর্বশেষ গল্প ‘রেইনকোট’। এ গল্পটিও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। তৎকালীন ঘোরলাগা সময়ে ভিতু অথবা সাহসী মানুষ এর ঘোরলাগা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত সমূহের কাহিনী ফুটে উঠেছে গল্পে। এক কথায় জীবন ও সমাজের দুঃখ, শোক, আনন্দ, নীচুতা ,অশ্লীলতা , কদর্যতা জানার জন্যে ও উপলব্ধির জন্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল বইটি অবশ্যই পরা উচিত