
User login
Sing In with your email
Send
Our Price:
Regular Price:
Shipping:Tk. 50
প্রিয় ,
সেদিন আপনার কার্টে কিছু বই রেখে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন।
মিলিয়ে দেখুন তো বইগুলো ঠিক আছে কিনা?
Share your query and ideas with us!
Was this review helpful to you?
or
বিন্দুর ভেতরে মহাসিন্ধু হাসনাত মোবারক পড়তে পড়তে যেন গহন ঘন এক ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন ছিলাম। রুদ্ধশ্বাস অবস্থা। পরবর্তী বাক্যে কী আছে, তা জানার প্রবল কৌতূহল। বলছি ধ্রুব এষের সদ্যঃপ্রকাশিত উপন্যাস ‘সাধু মঈন খাঁ, কাশেম ভাই প্রবাদ এবং আমি’র পাঠ প্রসঙ্গে। বইটি পড়ার সময় দারুণভাবে ডুবে ছিলাম দৃশ্যাদৃশে— চরিত্রগুলো যেন একের পর এক রিলে হচ্ছিল চোখের সামনে। দৃষ্টি ফেরালে বুঝি বিশাল কিছু মিস হয়ে যাবে! উপন্যাসটিকে মনে হচ্ছিল ধারণ করা কোনো সেলুলয়েড! রোমাঞ্চকর কাহিনি এবং নানা চরিত্রের সম্মিলন ঘটেছে এখানে। লেখকের প্রখর রসবোধসম্পন্ন বক্তব্য ও বর্ণনায় পেলাম সুখদ পাঠ-অনুভূতি। রচনার নিজস্বতা ও মনস্বিতায় উপন্যাসটির মান পৌঁছেছে শিল্পসৌকর্যের অনন্যতায়।‘সাধু মঈন খাঁ, কাশেম ভাই প্রবাদ এবং আমি’—এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, নাম চয়নের প্রাসঙ্গিকতা ফুটে উঠেছে যথাযথভাবে। মঈন খাঁসহ অন্যদের জীবনের এই আখ্যান। প্রত্যেকের জীবনই মহাজীবন। জীবনের পথ গজফিতা দিয়ে মাপা যায় না। কিন্তু ধ্রুব এষ শব্দ দিয়ে বাঁধতে জানেন জীবনের কথা। সহজ, মৃদু লয় ছন্দে জীবনের নির্মমতা তুলে ধরেছেন জাদুকরী গদ্যে। উপস্থাপন করা হয়েছে রূঢ় বাস্তবতা। কোনো রাখঢাক মানেননি। জীবন-জীবিকার শর্তে আমরা জড়িয়ে যাই কত বিচিত্র চরিত্রের সঙ্গে! তেমনি পেশার খাতিরে সাধু মঈন খাঁরও পরিচয় ঘটে একজন প্রকাশকের সঙ্গে।তাঁর নাম কাশেম। ধূর্ত, মহা বাটপাড় কাশেমের চরিত্র চিত্রণ করা হয়েছে। ঘটনার পাকে লেখকও যুক্ত সাধু মঈন খাঁর সঙ্গে পেশা ও সৃজনসূত্রে। প্রকাশক কাশেম ও তাঁর ভাগ্নে বনি। স্থূল প্রবৃত্তির এ দুই প্রকাশকের গ্যাঁড়াকলে পড়েন মঈন খাঁ ও লেখক। পাঠকের ভ্রম দূর করতে লেখক চরিত্রচিত্রণের এক জায়গায় বইটিকে জীবনীমূলক আত্মোপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বইটির কাহিনির বিস্তার ঘটেছে সাধু মঈন খাঁকে ঘিরে। আধ্যাত্মিক সাধনার এ মানুষটি পদে পদে ঠকেন। মানুষ ঠকে শেখে, কিন্তু সৃজনসাধনায় ব্যাপৃত এই মানুষটি কখনোই বৈষয়িকভাবে উন্নতি সাধন ঘটাতে পারেননি। মঈন খাঁ ছিলেন কবি, প্রুফ রিডার, তারপর নামেন প্রেস ব্যবসা ও গার্মেন্টস ব্যবসায়। এ কয়টিতেও বিফল। অভিনয় করেছেন তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ সিনেমায়। বইয়ের প্রচ্ছদও এঁকেছেন। মাছ চাষের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর এক ফাঁপরবাজের প্ররোচনায় নামেন কৃষিখামারে। সেখানেও ক্ষতির সম্মুখীন। আড়াই শ পেঁপেগাছের পেঁপে দেখে তাঁর মন উত্ফুল্ল। শেষে পাকা পেঁপে বুলবুলির ঠোকরানো থেকে রেহাই পেতে তিনি গাছে বিষ প্রয়োগ করেন। তখনই ঘটে আরেক বিপত্তি। মারা যায় ৪১৯টি বুলবুলি। মবের হাত থেকে সাধু মঈন খাঁ জানে বেঁচে আসেন। তবে মৃত বুলবুলির জন্য সাধু মঈন খাঁর হৃদয় এখনো দগ্ধ। একবার প্রকাশক কাশেম মঈন খাঁকে দিয়ে ৫০০ পাখির পরিচয় সংবলিত একটি বই লেখান। গ্রন্থটিতে ভুলক্রমে বুলবুলি পাখির ছবি বাদ পড়ে। প্রকাশের অনেক দিন পর পাখি নিয়ে মঈন খাঁর বইয়ের তথ্য পেলেন লেখক। লেখকের অনুমান, মঈন খাঁর বইয়ে বুলবুলি পাখির পরিচয় দেওয়া হয়নি। মঈন লেখকের কাছে এসে কৈফিয়ত দেন, ‘বুলবুলি নিয়ে আট শ উনচল্লিশ শব্দ আমি নিজে কম্পোজ করেছি, আপনার রিচার্ডের কাছ থেকে বুলবুলির ছবি নিয়েছি। বই বের হওয়ার পর দেখি বুলবুলির এন্ট্রি নাই...।’ তাঁর কথার উত্তরে লেখক মঈন খাঁকে সেই ৪১৯টি মৃত বুলবুলির কথা স্মরণে এনে বলেন, ‘এইটা হইলো প্রতিশোধ, বুঝছেন না, কাপাসিয়ার মৃত বুলবুলিদের প্রেতাত্মার প্রতিশোধ।’ এ রকম অম্ল-মধুর ঘটনাপরম্পরায় উপন্যাসটি এগিয়ে চলছে। অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে উপন্যাস শেষ হয়। প্রতিটি ঘটনাই পাঠকহৃদয়কে আলোড়িত করে, নাড়া দেয়। তবে প্রকাশক কাশেমের সঙ্গে লেখকের পাঠ চুকানোর ঘটনাটি হুদয়বিদারক, যা গভীরভাবে পীড়িত করে পাঠককেও। লেখককে শুরুতে কাশেম তাঁর ‘টাইমলাইন গ্রাফিকস’ হাউসকে অতিথিদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন লেখকের অফিস হিসেবে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায়, যথাস্থানে। করোনোর সময় দেখা যায় প্রকাশকের নগ্ন রূপ। এমনকি লেখককে কাশেম বলেন, ‘আপনি এক মাস কাজ না করলে কী হয়, ধ্রুব?’ প্রকাশকের এই কথা একজন প্রচ্ছদশিল্পীর শিল্পীসত্তায় চরমভাবে আঘাত হানে। সর্বশেষ সাধু মঈন খাঁ সুতার জাল ছেড়ে আটকা পড়েন লোহার জালে। কাশেমের ভাগ্নে বনির প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। পার্ট বাই পার্ট উঠে এসেছে আরো নানা গল্প। মঈন খাঁ চাকরিচ্যুত হলে লেখককে তিনি অনুরোধ করেন প্রকাশককে কিছু না বলতে। এভাবেই একজন মঈন খাঁ ছাড় দেন। প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে বরং নিজে পিষ্ট হন জীবন-জীবিকার চাবুকে। জীবনঘনিষ্ঠ লেখক ধ্রুব এষের দক্ষ উপস্থাপনাশৈলী মহাসিন্ধুও বিন্দুতে ধারণ করে। এ উপন্যাসেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। একটি পাঠ তৃপ্তিময় এই গ্রন্থ। বিবেককে নাড়া দেয়। আলোড়িত করে।




