User login
Sing In with your email
Send
Our Price:
Regular Price:
Shipping:Tk. 50
প্রিয় ,
সেদিন আপনার কার্টে কিছু বই রেখে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন।
মিলিয়ে দেখুন তো বইগুলো ঠিক আছে কিনা?
Share your query and ideas with us!
Was this review helpful to you?
or
nice book
Was this review helpful to you?
or
অতীতের অতিথিশালা থেকে বিবর্তিত হয়ে এখনকার আধুনিক হাসপাতালের সরাসরি এবং বাস্তবিক শারিরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি রোগ-রোগী-চিকিৎসা সেবকের যে দার্শনিক বলয় রয়েছে সেটা অনেকটা-ই নিচে পড়ে যায়, পক্ষান্তরে এই নৃতাত্ত্বিক চিন্তাকে মানুষ ভুলেও যায়। আমরা সেগুলোকে সহজ দৃষ্টিকোণ থেকে খুঁজে না পেলেও লেখক তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এজন্য তিনি এদেশের চিরায়ত সরকারি হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডকে বেছে নিয়েছেন। সেখানকার দুঃখ, দূর্দশার পাশাপাশি সৃজনশীলতাকেও গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নৃবিজ্ঞানী হিসেবে লেখক নিরপেক্ষ থেকে তাঁর গবেষণার পর্যবেক্ষণগুলোকে নানাভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন। কোনোরূপ উপসংহারে না গিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে রোগ ও রোগীর পাশাপাশি সমস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোতে এখনও স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় সামরিক খাতের বাৎসরিক বাজেট বহুলাংশে বেশি। এমন নানা অসঙ্গতির দরুণ চিকিৎসা সেবা নিতে আসা জনগণ তার প্রাপ্য চিকিৎসা পায় না বা পেতে নানা কাঠখড় পোড়াতে হয়। এদেশের ধনাঢ্যরা আধুনিকায়নের সকল সুযোগ পেলেও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নিতান্ত গরীব মানুষগুলো অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। হাসপাতালের একজন বড়লোক ডাক্তার ছোটলোক গরীব রোগীদের ওপর কর্তৃত্ব করেন। ডাক্তাররা ভাবেন- রোগের কারণ, নাম বা রোগমুক্তির উপায় এসব গরীব-অশিক্ষিত রোগীরা বুঝবে না এবং বোঝানোর প্রয়োজনও তাঁরা অনুভব করেন না। একটু সদ্ব্যবহার একজন রোগীকে কতটা সারিয়ে তুলতে পারে সেই মনস্তাত্ত্বিক বোধটুকু এদেশের শিক্ষিত চিকিৎসক সমাজে এখনও তৈরি হয়নি। এই অশিক্ষা দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে তৈরি হওয়া; যার সাথে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রের সব অনিয়ম। এই দুইয়ে মিলে হাসপাতাল নামের প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে জনগনকে ঠকানোর ভিন্ন কোনো উপায় হিসেবে। অপরদিকে, দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত হওয়ার ফলে চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতার বদলে নানা কুসংস্কারে ডুবে থাকে। অশিক্ষা, অসচেতনতা ও কুসংস্কার মিলে তাঁদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ভয়ের সংস্কৃতি। চিকিৎসা নিতে গিয়ে হাসপাতালের ব্যবস্থাকে সহজ করার বদলে আরো জটিল করে ফেলে। যার ফলে- সেবা দাতারাও তাঁদের সেবা প্রদানে ক্রমশ আগ্রহ হারায়। অনেকটা নিজেদের দোষেও তাঁদেরকে বিরূপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। একটি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবাকে কেন্দ্র করে রোগী, ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়া, রোগীর আত্মীয় স্বজন সহ চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত সবার সাথে একটি খণ্ডকালীন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। লেখক শাহাদুজ্জামান তাঁর লেখা একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙা হাড় বইয়ে সেই সম্পর্ককেই দেখানোর চেষ্টা করেছেন। হাসপাতাল জীবনকে তিনি ক্ষুদ্র বাংলাদেশ হিসেবে মঞ্চায়িত করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজনের তুলনায় কম লোকবল, দায়িত্বের অসম বণ্টণ, অর্থিক অসচ্ছলতা সহ নানা অসঙ্গতি নিয়ে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। উন্নত বিশ্বের সাথে রয়েছে যার বিস্তর পার্থক্য। সেটা যে কেবল প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে তা নয় বরং রোগী-ডাক্তার ও অন্যান্য স্টাফদের আচরণ গত দিক দিয়েও। মানুষের এই ভেতরকার বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পূর্ণ-ই মনস্তাত্ত্বিক। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অনেকটা অগ্রসর হলেও এই আচরণগত দিকের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বছরের পর বছর ধরে যা একটু একটু করে মস্তিষ্কে প্রোথিত হয়েছে এবং সমস্যার পাশাপাশি বৃহদাকার সংকট তৈরি করেছে। এই বইয়ে সেই সংকট গুলোকেই বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উত্থাপন করা হয়েছে। বই পর্যালোচনা- বইয়ের নাম: একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙা হাড় লেখক: শাহাদুজ্জামান প্রকাশনী: মাওলা ব্রাদার্স পৃষ্টা সংখ্যা: বইয়ের দাম: ৩০০ টাকা (রকমারি মূল্য) ------------ ফোরকান ৬ জুলাই ২০২২
Was this review helpful to you?
or
All doctors should read.
Was this review helpful to you?
or
oshadharon
Was this review helpful to you?
or
অনেকটা অজ্ঞ হয়েই বইটি কিনেছিলাম। বইটি কেনার আগে আমি এই বই সম্পর্কে কোনো রিভিউও পড়িনি। বইটি কেনার সময় ভেবেছিলাম এটা হয়তো কোনো থ্রিলার উপন্যাস হবে। বইটি যেদিন হাতে পেলাম সেদিন বইটি খুলে দেখি এটা কোনো থ্রিলার উপন্যাস না হলেও এ হলো বাস্তব জীবনের কিছু থ্রিলারিটির প্রতিফলিত চিত্র। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে কত প্রকার বিভৎস কাজ চলছে তারই এক প্রামাণ্য চিত্র এ বইয়ে দেওয়া আছে। অনেকগুলো কাহিনীকে এই বইতে একজায়গায় করা আছে। এই বইয়ে আছে বাংলাদেশের হাসপাতালের দুইপক্ষের চিত্র। এক পক্ষ হলো ডাক্তার, নার্স আর অন্য পক্ষ হলো রোগী ও তার স্বজনরা। সাথে আছে চিকিৎসাক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের ইতিহাস ও অজানা কিছু তথ্য।
Was this review helpful to you?
or
অসাধারণ একটা সাহিত্যকর্ম।
Was this review helpful to you?
or
excellent
Was this review helpful to you?
or
বইটি পড়ে বেশ ভালো লেগেছে, গবেষণামূলক বই হিসেবে এটিকে 'বোরিং' মনে হয়নি।
Was this review helpful to you?
or
Please,restock this book as soon as possible.
Was this review helpful to you?
or
একটি সরকারি কলেজ হাসপাতালের বাস্তব প্রতিচ্ছবিঃ- একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙ্গা হাড়। একটি সরকারি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র কেমন হতে পারে তা জানতে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। অামাদের মতো নিম্নবিত্তের সে ধারণা কম বেশি অাছে বৈ কি! কিছু হলে ছুটে চলে যাওয়া হয় সরকারি হাসপাতালের করিডোরে। কিন্তু অামাদের ভাগ্যে চিকিৎসার নামে কি জোটে তা হয়তো অনেকে জেনেও না জানার ভান করে থাকেন। যারা সচক্ষে জানের তারা ঐ চোখের সামনের ঘটনাটুকু। কিন্তু মোদ্দা ব্যাপার তো রয়ে যায় লোক চক্ষুর অাড়ালে। হাসপাতালে আছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই, আছে আশা-নিরাশার নাগরদোলা। হাসপাতাল কারো জন্য রোগ নিরাময়ের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, অাবার কারো জন্য বিভীষিকার অন্ধকূপ। বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপর একটি নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা ভিত্তিতে লেখা এই বইতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের ভেতরকার বিচিত্র বাস্তব চিত্র! শাহাদুজ্জামানের গবেষণাধর্মী লেখার জুড়ি মেলা ভার। একজন কমলালেবু, ক্রাচের কর্নেল এর মতে অসাধারণ লেখা যার থলেতে অাছে তার অসাধারণ লেখনীতে নির্মিত এই গবেষনাধর্মী লেখা। একটা থিসিস পেপার থেকে যে এত উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য হতে পারে তা অামার জানা ছিলো না। লেখক বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর একটি নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা করেছেন। নিজের উচ্চতর ডিগ্রির জন্য তিনি একটি হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ডাক্তার, নার্স, রোগী, রোগীর অাত্মীয়, অায়া, ঝাড়ুদার সহ সকল প্রকার মানুষদের দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেই গবেষণার ভিত্তিতে লেখা এই বইতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের ভেতরকার বাস্তব সব চিত্র। বইয়ের ভেতর যে সমস্ত বিষয়ের বর্ণনা করা হয়েছে তা লিখতে খুব একটা কেও সাহস করে না। লেখাটি স্রেফ একটি বই নয়, গল্পটি একটি গবেষণা ধর্মী লেখা সুতরাং লেখায় সত্যিকার চিত্র চিত্রিত হয়েছে। আধুনিক সমাজের অন্যতম জটিল একটি প্রতিষ্ঠান হল হাসপাতাল। যেখানে সেবার সাথে অায়-উপার্জনও সম্ভব। কিন্তু সেখানে ভোগান্তিও খুব বেশি। যেখানে ডাক্তারের থেকে অায়া বুয়াদের খবরদারী চলে বেশি চলে। হাসপাতালে থেকে চেম্বারে বেশি সময় যায় ডাক্তার বাবুদের। হাসপাতালের ঔষধ যায় ফার্মেসীর দোকানে। সব মিলে একটি ঘুনেধরা সিষ্টেম অার অর্থ-লোক বলের অভাবে ভেঙে পড়া মেরুদণ্ড দিয়ে অর্ধ শোয়া সমাজ। কিভাবে ঘটে এইসব? সব কিছু কি হত্যাকর্তাদের অগোচরে? সকল ক্ষমতার উৎস কোথায়? অার কেনই বা ঘটে এই সব। যেখানে সেবার থেকে টাকার খেলা সেখানে এমন চিত্র কি স্বাভাবিক ঘটনা? মোদ্দা কথা একটি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে যদি অাপনার অাগ্রহ থাকে তবে এই বই অাপনার জন্য। হাসপাতালে একজন রোগীর ভাগ্যে কি ঘটে, একজন নার্সের খিটমিট স্বভাব অার ডাক্তারের গতিবিধি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই বই অাপনার জন্য। সুখপাঠ্য লেখা পড়তে অাগ্রহী হলেও এই বই অাপনার জন্য। নন ফিকশন মানে খটমট শব্দে দাঁতভাঙা উচ্চারণের উচ্চ মার্গীয় অালোচনা। কিন্তু লেখক এই ধারাকে ভেঙেছেন। খুব সহজ সরল সাবলীল শব্দের নন ফিকশন খুবই কম পড়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালে উপর গবেষণা নিয়ে এমন অসাধারণ বর্ণনা বাংলায় অামার চোখে পড়েনি। তবে লেখক হিসাবে একটা জিনিস করেছেন তা হল গল্পের শেষে মাঝে কোথাও সমস্যার সমাধান টানেননি। এত এত সমস্যা, ঘটনার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা করে গেছেন কিন্তু সমাধান রেখে গেছেন সাধারণ মানুষের উপর। তবে পরিশেষে বলতে হয়, অাদ্যোপন্ত চিন্তা ভাবনা বদলে দেওয়ার জন্য এই বই অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। বইঃ একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙ্গা হাড়। লেখকঃ শাহাদুজ্জামান প্রকাশনীঃ মাওলা ব্রাদার্স মূল্যঃ দুইশত পঞ্চাশ টাকা।
Was this review helpful to you?
or
শাহাদুজ্জামানের লেখা বই গুলোর মধ্যে অনেক চমৎকার একটি বই এটি।হাসপাতালের ভিতরকার বিচিত্র সব রহস্যময় চিএ সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে বইটির মধ্যে।লেখককে অনেক সাধুবাদ।
Was this review helpful to you?
or
বইটি পড়ার আগে চিন্তা করতে পারিনি এত ভালো লাগবে ♥️
Was this review helpful to you?
or
২ টাকা বেতনের পেশা যে করে, তার থেকে ২ হাজার টাকার সেবা আশা করা মূর্খতা। এটি ছিল এই বই থেকে প্রাপ্ত আমার শিক্ষা। আমরা অনেকেই আমাদের দেশের হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সেবা নিয়ে নাক কুঁচকাই, এমনকি কখনো কখনো বিদেশের হাস্পাতালের সাথে ব্যাপক তুলনা করি। কিন্তু এই আমরা রোগীরা এবং আমাদের সেবা দানকারী ডাক্তারের মাঝে যে কি বিশাল একটা ব্যবধান বা দূরত্ব, সেটার সেতু স্থাপনের চেষ্টা করা একটি বই বলে আমার মনে হয়েছে। লেখকের ন্রি-বিজ্ঞান সাধনা এবং খুঁটে খুঁটে প্রতিটি তত্ত্বকে টোকানো এই বইকে এক অসাধারণ রুপ দিয়েছে। যারা পড়তে পারেন, তাদের অবশ্যই এই বইটা পড়া উচিৎ কারণ এখানে ফারাক বুঝবার জায়গা আছে এমনকি আছে সচেতন হবারও। কালে কালে এমন বই অনেক আসে, কিন্তু আমাদের অগোচরে বা অজ্ঞতার বশে থেকে যাওয়াতে আমাদের কল্যাণের বাধা চিরকালই আছে। I want to say, ONE OF THE MASTERPIECE OF BENGALI LITERATURE
Was this review helpful to you?
or
চমৎকার একটি বই। যদিও গবেষণা ধর্মী বই, তবে খুব প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা। হাসপাতাল নিয়ে অনেক তথ্যের পাশাপাশি এটি গবেষণা সম্পর্কে জানতেও সাহায্য করবে।
Was this review helpful to you?
or
হাসপাতাল জীবন শুধু লেখকদেরকেই কৌতূহলী করেনি, সকল মানুষের কাছে এখনো বিষয়টি রহস্যময়। নরবিজ্ঞানিরা এই নিয়ে কম গবেষনা করেনি এবং তাদের গবেষনা বর্তমানেও চলমান তা নিয়ে সন্দেহ নেই। লেখক শাহাদুজ্জামান তাদের থেকে ব্যাতিক্রম নয়, তিনি এই গবেষণামূলক প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন হাসপাতেলের ক্ষুদ্র একটি বিভাগের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাকে, যা পুরো বাংলাদেশের অর্থ-সামাজিক পরিবেশকে চিত্রিত করে। এই গ্রন্থে তিনি আরো আলোচনা করেছেন আমাদের মহাদেশে হাসপাতালের উৎপত্তি হয়েছে কিভাবে, তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন প্রত্যেকটি মানুষের চরিত্র যা পুরো বাংলাদেশের কথা বলে। এই হাসপাতালে ১ম শ্রেনী থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সবার রাগ কমানোর একটি মাত্র পন্থা রোগীর সাথে খারাপ ব্যবহার করা কিন্তু কেউ এর ভেতরের খবর জানতে ইচ্ছুক না। অন্যদিকে চার ফুট বাই সাত ফুট বিছানায় শুয়ে সেই হাড় ভাঙা রোগী চিন্তা করে কবে সে এই একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পাবে। তাদের কথা শোনার মত কেউ নেই সবাই সবার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এই জীবনে এসে তারা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নিঃস হয়ে যাচ্ছে। এখানে সেবিকারা কাগজ-কলমের জালে বন্দি হয়ে গিয়েছে তারা রোগীদের থেকে বেশী সময় ব্যয় করে চেয়ার টেবিলের সেবায়,চাইলেও তারা নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনা, কারো কারো এতে কষ্ট থাকলেও অনেকের আবার এই জীবনেই আনন্দ। তবে একটি মাত্র দুঃখ,এখনো সমাজের চোখে তারা অনেক অবহেলিত। ডাক্তার নাম শুনলেই হয়ত সাদা এপ্রোন পরা সিনেমার কোনো নায়ক অথবা নায়িকার কথা মনে পরে, তাদের জীবন বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে হয়ত অনেক চকচকে মনে হয় কিন্তু আদৌ কি তাদের জীবন এত উজ্জল? এই বইতে দেখা যায় কেউই তাদের নিজেদের জীবন নিয়ে সুখী নয়। এখানে হাসপাতাল জীবনের মরমান্তিক সত্য তুলে ধরেছেন যা আমাদের অনেকের কাছে হয়ত অজানাই ছিল। লেখক তার পিএইচডি সনদ পেতে গবেষণা অভিসন্দর্ভের জন্য বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের ওপর নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজ। ওই গবেষণার ফলাফল হিসাবে তিনি বাংলাদেশের হাসপাতাল ব্যবস্থার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মাত্রাগুলা তুলে ধরেছেন এবং এই গবেষনার শেষে লেখক তার চেনা জানা সেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে চিনতে পারলেন নতুনভাবে ।
Was this review helpful to you?
or
শাহাদুজ্জামানের এই নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণার সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হচ্ছে বাংলাদেশে বিদ্যমান ঔপনিবেশিক ধাঁচের হাসপাতাল ব্যবস্থার ব্যর্থতার বয়ান। এই বাংলাদেশ একই সাথে গরিবি হালতের দেশ, আশরাফ আতরাফ চরম ফারাকের সমাজ, পরিবারকেন্দ্রিক, পুরুষপ্রধান, নৈতিকভাবে দুর্বল, সহিংস কিন্তু একই সঙ্গে সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন। এক. ফ্রাস্টেটেড লেডি উইথ দ্য ফাইলস; শাহাদুজ্জামানের বর্ননায় বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের নার্সদের অবস্থা যেমনটি এসেছে তাতে ইংরেজি এই শব্দবন্ধটি রচনা না করে পারা গেল না। ফাইলওয়ালি হতাশ নারী; যা কিনা আধুনিক হাসপাতালের পরিসরে নার্সের আদর্শ রুপ- লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প বা প্রদীপওয়ালি নারী খ্যাত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর তরিকার পুরো বিপরীত অবস্থা। শাহাদুজ্জামান তার ‘একটি হাসপাতাল একজন নৃবিজ্ঞানী ও কয়েকটি ভাঙ্গা হাড়’ গবেষণা গ্রন্থে লিখছেন, বাংলাদেশের নার্সরা বরং প্রদীপবিহীন, হতাশ একদল নারী যারা ওয়ার্ডে কেবলই ফাইল আর রেজিস্টার নিয়ে ছুটাছুটি করছেন। মানে সেবা নয়, সেবিকারা বরং প্রশাসনিক এবং করণিক সুলভ কাজে ব্যস্ত। বিশেষত গবেষকসুলভ মনযোগ দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যেই ওয়ার্ডে এই প্রদীপবিহীন হতাশ সেবিকাদের ছুটাছুটি করতে দেখেছেন শাহাদ- সরকারি হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডের প্রায় সব রোগীর কাছে তা হাড়ভাঙ্গা ওয়ার্ড বলে পরিচিত। কেতাবি নামে অর্থোপেডিক ওয়ার্ড। শাহাদুজ্জামান তার পিএইচডি সনদ পেতে গবেষণা অভিসন্দর্ভের জন্য বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের ওপর নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজ। ওই গবেষণার ফলাফল হিসাবে তিনি বাংলাদেশের হাসপাতাল ব্যবস্থার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মাত্রাগুলা তুলে ধরেছেন। নেদারল্যান্ডস এর আর্মস্টারডাম ইউনিভার্সিটির অধীনে ২০০৩ সালে ওই পিএইচডি সনদটি অর্জনের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের নৃবিজ্ঞানে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলেন শাহাদুজ্জামান। শাহাদের অভিজ্ঞতার ডাক্তারেরা কেমন? এবিষয়ে লেখক মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্তজনের কাছে ডাক্তারের চে’ কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তারেরা অনেক বেশি প্রিয়। সেই জনপ্রিয়তার একটি আলামত হচ্ছে; কবিরাজ বা গ্রাম্য চিকিৎসকরা ভুল চিকিৎসা করলেও রোগীরা তাকে দোষ দেয় না। অথচ ডাক্তার সামান্য ভুল করলেই তার দুর্নামের অন্ত থাকে না। শাহাদুজ্জামানের পর্যবেক্ষন হচ্ছে, একই যাত্রায় এই ভিন্ন ফলের কারণ হল কবিরাজের সাথে এদেশের দরিদ্র মানুষদের একটা সামাজিক নৈকট্য। যেই নৈকট্য নাই হাসপাতালের ডাক্তারের সাথে। নাই। কারণ, দরিদ্রজনেরে সেই নৈকট্য দিতে ব্যর্থ হন উচ্চশিক্ষিত সরকারি চিকিৎসকেরা। নাই। কারণ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের যাবতীয় জ্ঞান নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করার মাধ্যমে ডাক্তাররা নিজেদের একটা ক্ষমতাধর পেশাগত গোষ্ঠী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন- নিম্নবিত্ত রোগীদের সাথে তারা আচরণ করেন ক্ষমতাবান শ্রেনীর জায়গা থেকেই। পশ্চিমেও কিন্তু ডাক্তারদের এই কর্তৃত্ব অনেকটাই বিদ্যমান। তবে সেখানে রোগীদের সামনে কর্তৃত্বের এই মুশকিলের আসানও আছে। সেখানে রোগীর অধিকারটুকু আদায় করতে ডাক্তার আইনগতভাবে বাধ্য। বাধ্যবাধকতা থেকে সচেতনতাও তৈরি হয়েছে। আর বাংলাদেশে রোগীর শ্রেণীগত অবস্থান হচ্ছে সবার চে’ নিচে। ডাক্তার থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার সবার চে’ নিচে। ডাক্তার থেকে শুরু করে হাসপাতালের সবার কর্তৃত্বপরায়নতার শিকার হতে হয় রোগীদের, এমনকি ঝাড়ুদার কিম্বা আর সব চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের কর্তৃত্বেরও। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী। হ্যাঁ। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী। লেখকের পর্যবেক্ষন অনুসারে, বাংলাদেশের হাসপাতালের সব চে’ ক্ষমতাধর শ্রেণী হচ্ছে ওয়ার্ডের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা। ডাক্তারদের অনুমোদনে ওয়ার্ডের শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে প্রায়ই নিষ্ঠুর দুর্ব্যবহার করে এই কর্মচারীগণ। এরা শ্রেণীগতভাবে নিম্নবিত্ত হলেও সামাজিক পুঁজির শক্তিতে তারা সব সময়ই দাপট বজায় রাখে, রোগীদের দাপটায়, দাবড়ায়। হাসপাতাল জীবন সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা, কাজের দক্ষতা এবং ডাক্তার- নার্স-রোগীদের নির্ভরশীলতাই হচ্ছে এদের সামাজিক পুঁজি। এই শ্রেনীটি কিভাবে হাসপাতালে রীতিমত একটা অপরাধচক্র গড়ে তোলে নিজেদের ক্ষমতার প্রয়োগে, তার বিবরণ দিয়েছেন শাহাদুজ্জামান। এই দূরবর্তী ডাক্তার, সেবাভিন্ন কাজে ব্যস্ত সেবিকা ও চতুর্থশ্রেনীর কর্মচারীদের অপরাধচক্রের কর্তৃত্বপরায়নতার মধ্যে রোগীদের কি হাল? সরকারি হাসপাতালগুলার অধিকাংশ রোগীই মূলত নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত এবং দরিদ্র। হাসপাতালের অচেনা ও অজানা নিয়ম-কানুন বুঝতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। আবার শারীরিক অসুস্থতার কারণ বা অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব হয়ে ওঠে না তাদের পক্ষে। বরং কিছু জানতে চাইলে ডাক্তার বা নার্সরা উল্টো ক্ষেপে যান। অন্যদিকে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণে এই রোগীদের সবাইকে পেশাগত কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। এই নিম্নবিত্ত জনের পেশা এমন যে, সবেতন ছুটি দূরের কথা, ছুটিই নাই। ফলে হাসপাতালে থাকাকালে তাদের উপার্জনহীন থাকতে হয়। অথচ তখনো পরিবারের সব খরচ মেটানোর পাশাপাশি তাকে হাসপাতালের যাবতীয় খরচও বইতে হয়। ফলে রোগী ও তার পরিবার অর্থনৈতিক ক্ষতিতে পড়ে, দায়দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অসুস্থতা এভাবে একদিকে রোগীর শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে তার অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তবে এত দুর্দশা সত্ত্বেও রোগীরা এই হাসপাতালেই ভিড় করে। কারণ এ ছাড়া তাদের কাছে আর কোন বিকল্প উপায়ও নাই। সরকারি হাসপাতাল ছাড়া কোথাও তাদের সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসা সেবা পাওয়া সম্ভব না। লেখক মনে করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণে রোগীদের যেই পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় তা দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্যের সাথেই সম্পর্কিত। এদেশে স্বাস্থ্য খাতে হাসপাতালগুলোর জন্য যে বাজেট বরাদ্দ থাকে তা দিয়ে অর্ধেক ব্যয় মেটানোও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত এই ব্যয়ের বোঝা সাধারণত রোগী কিংবা তার আত্মীয়-স্বজনের ঘাড়েই এসে পড়ে। ফলে রোগীদের নিজের পকেট থেকেই হাসপাতালের পুরো ব্যয়ভার মেটাতে হয়। শাহাদ লিখছেন, বাংলাদেশ সরকার যখন একটা নতুন ফাইটার জেট কেনে তখন এই দেশের হাসপাতালের একজন প্রফেসর তার ওয়ার্ডের একমাত্র কাঁচিটি হারিয়ে হা-হুতাশ করতে থাকেন। লেখকের এ মন্তব্য থেকেই আমাদের দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা সহজেই অনুমান করা যায়; যদিও শুধু স্বাস্থ্য কেন, যে কোনো খাতে তুলনামূলক কম রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের কথা জানাতে গিয়ে অনিবার্যভাবে প্রতিরক্ষা ব্যায়কে খলনায়কের ভূমিকায় দাড় করিয়ে দেয়ার চর্চাটি বাংলাদেশে বেশ পুরানো, ক্লিশে এবং একটি চিহ্নিত আর্থরাজনৈতিক মতাদর্শী্। দুই. শাহাদুজ্জামান তার এই গবেষণাগ্রন্থটি শুরু করেছেন আধুনিক যুগের হাসপাতাল নামক প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ও বেড়ে ওঠার বিবরণ দিয়ে। হাসপাতাল আধুনিক সমাজের জটিলতর একটি প্রতিষ্ঠান। লেখক দেখেছেন যে, হাসপাতালের জীবন বাংলাদেশের বিভিন্ন সমাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যেরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তিনি হাসপাতাল ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সব শ্রেণীর মানুষের আচরণ তুলে এনেছেন শ্রেনী বিন্যাস করে। দেখিয়েছেন আধুনিক ‘জীবন রক্ষাকারী’ প্রযুক্তি ও আমলাতন্ত্র কিভাবে হাসপাতাল ব্যবস্থাকে আরো জটিল করে তুলছে। শাহাদুজ্জামানের এই নৃতাত্ত্বিক গবেষণার সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হচ্ছে বিরাজমান ঔপনিবেশিক ধাঁচের হাসপাতাল ব্যবস্থার ব্যর্থতার বয়ান। লেখক শুরু করেন হাসপাতাল ব্যবস্থার ইতিবৃত্ত দিয়ে- আধুনিক ইংরেজির হসপিটাল শব্দটির উদ্ভব প্রাচীন ল্যাটিন হসপিটালিস শব্দ থেকে, যার অর্থ অতিথি। ইওরোপে হাসপাতালের মত প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্ম মূলত অতিথিশালাগুলোতে। শহরে এবং চলাচলের দীর্ঘ পথের নানা বিরতির স্থানে সরাইখানা কিম্বা অতিথিশালাগুলোতে আগত অতিথিদের মধ্যে অসুস্থদের চিকিৎসা ও সেবাশুশ্রুশার ব্যবস্থা ছিল। এসব অতিথিশালায় রোগীর চিকিৎসার চাইতে সেবা শুশ্রƒসাই মুখ্য ছিল। সবমিলিয়ে বাড়ির বাইরে চিকিৎসার জায়গা বলতে ছিল এই এক অতিথিশালাই। শিল্প বিপ্লবের সময়ে অতিথিশালা থেকে এই সুবিধা বাইরেও ছড়িয়ে যায়। আলাদা করে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে চিকিৎসার জন্য। সেই সময়ে রোগের পিছনে আগেকার মত আধ্যাত্মিক কারণ না খুঁজে জাগতিক ও শারীরিক কারণ খোঁজার ঝোঁক তৈরী হয়। ফলে রোগ ও চিকিৎসা; এই দুইয়ের ধারনাই ধর্মীয় থেকে জাগতিকের দিকে যাত্রা করে। তখনো পর্যন্ত হাসপাতাল ব্যবস্থা এখনকার মত এতটা জটিল ছিল না। ফরাসি বিপ্লবের পর হাসপাতালগুলোতে এক ধরনের বাধ্যতামূলক শৃঙ্খলাপূর্ন কর্মপদ্ধতি দাড় করানো হয়। একইসাথে, রোগী তখন ডাক্তারি প্রশিক্ষণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ ব্যবস্থায় ডাক্তারদের আলাদা শ্রেনীগত অবস্থান তৈরী হয়। আর হাসপাতালও দরিদ্র ও অসহায়দের আশ্রয় থেকে ধনীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ইওরোপে হাসপাতাল ব্যবস্থার বিকাশের এই তত্ত্ব শাহাদুজ্জামান জানাচ্ছেন দার্শনিক মিশেল ফুকোর দি বার্থ অব দি ক্লিনিক বই এর বরাতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে ঔপনিবেশিক জ্ঞানপ্রকরণ- নৃবিজ্ঞানের সম্পর্কসূত্র যিনি প্রথম জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি হলেন মিশেল ফুকো। তবে নৃবিজ্ঞানের শাখা হিশাবে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান বিকশিত হওয়া শুরু করে আশির দশকের গোড়ার দিকে। বেশ কয়েকজন নৃবিজ্ঞানী পশ্চিমা হাসপাতালের উপর সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করলেও এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলাতে এ নিয়ে তেমন কোন কাজ হয় নাই। সেক্ষেত্রে উপনিবেশ উত্তর কোন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও হাসপাতালের চরিত্র বুঝতে শাহাদুজ্জামানের এই গবেষণা গ্রন্থটি সহায়ক হবে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলাতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইওরোপের মত করে ঘটে নাই। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোতে এলোপ্যাথি চিকিৎসা এসেছে উপনিবেশি শাসকগোষ্ঠী, এবং বিশেষত উপনিবেশি খ্রিস্টান মিশনারিদের হাত ধরে। উপনিবেশ বিস্তারে বড় বাধা ছিল রোগ-বালাই। ঔপনিবেশিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে একটা সুস্থ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ছিল যাদের শ্রম ব্যবহার করা যাবে। কাজেই শরীর সুস্থ রাখতে ও শরীরের অসুখ সারাতে ইওরোপীয় এলোপ্যাথি পদ্ধতির হাসপাতাল এইসব দেশে বানায় ঔপনিবেশিক শাসকেরা। বৃটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষ কিম্বা তার অন্তর্ভূক্ত বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতবর্ষে হাসপাতালের জন্ম ইতিহাস জানান দেয়ার পরে লেখক তুলে ধরছেন এই বাংলাদেশের হাসপাতালের বিভিন্ন অংশীদারদের বিবরণ, তার গবেষণাধীন অর্থোপেডিক ওয়ার্ড অবলম্বনে। এখানে রোগীর আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালের কার্যক্রমের অনানুষ্ঠানিক অংশীদার। রোগীর সেবা শুশ্রুষার প্রায় সব রকম কাজই মূলত তারাই করেন। যে কাজটি নার্সদের করার কথা। সাধারণভাবে আমরা নার্সিং পেশার কাজ বলতে যা বুঝাই আমাদের দেশের নার্সরা তার সামান্যই করে থাকেন। ওয়ার্ডের রিপোর্ট, রেজিস্টার, ফাইল ইত্যাদি ঠিকঠাক করতেই তাদের অধিকাংশ সময় পেরিয়ে যায়। আর তাই রোগীর পরিচর্যার কাজটি তার আত্মীয়-স্বজনের ওপর ছেড়ে দিয়ে তারা বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আমাদের দেশের নার্সদের অবস্থাটা লেখক বর্ণনা করেছেন এভাবে, বাংলাদেশের নার্সরা বরং প্রদীপবিহীন, হতাশ একদল নারী যারা ওয়ার্ডে কেবলই ফাইল আর রেজিস্টার নিয়ে ছুটাছুটি করছেন। নার্সদের মূল দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসার পেছনে নার্স সংখ্যার সংকট ও নার্সদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়াকে দায়ী বলে মনে করেন অনেকে। তবে লেখকের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এর পেছনে গভীর অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণও আছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম হওয়ার কারণে হাসপাতালে প্রশাসনিক স্টাফের ব্যাপক স্বল্পতা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে নার্সদের দিয়েই যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করানো হয়। আরেকটি কারণ হচ্ছে স্বাধীনতার পর অনেক ধর্ষিতা ও সামাজিকভাবে পরিত্যক্ত নারীকে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় নার্সিং পেশায় নিয়োগ দেয়া হয়। এতে ঐতিহাসিকভাবে এ পেশার প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণা জন্ম নিয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে নার্সিং পেশার এখনো বিশেষ কোন সামাজিক সম্মান নাই। লেখক এর পেছনে ধর্মীয় কারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। হিন্দু সমাজে এই পেশা অপবিত্র ও নিম্নবর্ণের কাজ হিশাবে বিবেচিত হয়। আবার মুসলমান সমাজে এই পেশাকে নারীদের চরিত্রস্খলনের মাধ্যম হিশাবে গণ্য করা হয়। সবমিলিয়ে ঘটনা দাড়ায় এই যে, সরকারি হাসপাতারগুলোতে নার্সরা আর তেমন সেবাকাজে রত নন। তারা ফাইল পত্র নিয়ে ব্যস্ত। রোগীর সেবা করেন রোগীর আত্মীয় স্বজনরাই। বাংলাদেশের সমাজে এই সেবা নারীরা করলেও হাসপাতালের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন। সেখানে পুরুষ আত্মীয়রাই সাধারনত রোগীর অ্যাটেনডেন্টের দায়িত্বটা বেশি পালন করে। শাহাদুজ্জামান বাংলাদেশের সমাজে মেয়েদের পর্দার ধারণা ও জনজীবনে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণকে এর কারণ হিসাবে দেখেছেন। কিন্তু এই দুয়ের বাইরেও সমাজ কাঠামোতে বিদ্যমান আরো কিছু অনুষঙ্গ তার চোখ এড়িয়ে গেছে। তার গবেষণাটি যেই ধরনের হাসপাতাল কেন্দ্র করে, সেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে যারা চিকিৎসা নেন, সেই নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে পুরুষেরা শুধু উপার্জনের কাজটুকুই করেন। সংসারের প্রায় বাকি সব কাজের দায়ভার নারীর ওপরই বর্তায়। দুই-একদিন অর্থ উপার্জন না করলেও তার কোন না কোন ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু একদিন উনুনে হাঁড়ি না চাপলে যেন পরিবার পত্তনির আর কোনো মানে থাকে না সমাজে। এসব কাজ গুছিয়ে নারীর পক্ষে অতটা সময় হাসপাতালে দেয়া সম্ভব না। কাজেই তুলনামুলক কম ব্যস্ত পুরুষই এই দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের কর্তৃত্বপরায়ন এবং পুরুষালি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রোগীর প্রাপ্য সুবিধাটুকু আদায় করে নেয়াটা নারীর পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়ে। যেই কর্তৃত্বপরায়নতায় প্রধানত নের্তৃত্ব দেন খোদ চিকিৎসকগণ। উচ্চশিক্ষিত ডাক্তারগণ। বাংলাদেশে হাসপাতাল নামক উপনিবেশি রাজ্যের রাজাটি হলেন ডাক্তার। শাহাদুজ্জামান এই ডাক্তারদের আচরণে একইসাথে কর্তৃত্বপরায়নতা, উদ্ভাবনীশক্তি ও গভীর হতাশার সমন্বয় লক্ষ্য করেন। গবেষকের মতে, মেডিকেল পেশার প্রশিক্ষণের ধরন, ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং কাজের পরিবেশ ডাক্তারদের মধ্যে কর্তৃত্বপরায়নতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্যের জন্ম দেয়। উপনিবেশি আমল থেকেই এদেশে ডাক্তারদের ক্ষমতাবান, বিত্তবান ও সুবিধাভোগী হিশাবে বিবেচনা করা হত। ডাক্তারদের সামাজিক আভিজাত্যের এই বোধটি এখনো প্রবল। দেশে সাধারণত সব চাইতে মেধাবীরাই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে এক ধরনের অহংকারবোধ কাজ করে। তা থেকেই পেশাগত জীবনে অন্যের ওপর কর্তৃত্ব করার প্রবণতা তৈরী হয়। অনেক গবেষক মনে করেন, হাসপাতালে রোগীর জীবনের অনিশ্চয়তা এবং লোকবল, ঔষধ ও উপকরণের স্বল্পতা ইত্যাদিও ডাক্তারদের মেজাজের ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য অনেকাংশে দায়ী। তবে যতই কর্তৃত্বপরায়নতার সাথে সাথে সরকারি হাসপাতালগুলির সব ডাক্তারই ব্যক্তিগতভাবে হতাশায় নিমজ্জিত। চাকুরির অনিশ্চয়তা, উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ, প্রত্যাশিত জীবনমান অর্জন করতে না পারা, নিজেদের মধ্যে রেষারেষি, পদোন্নতি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও রোগীদের অবজ্ঞা তাদের হতাশার কারণ। অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ শেষে বাংলাদেশের হাসপাতাল ব্যবস্থা সম্পর্কে লেখকের মত তার ভাষায়, অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে আমি সেই বাংলাদেশ দেখেছি যা দরিদ্র, তীক্ষ্ম উঁচু নিচু ভেদবোধসম্পন্ন, পরিবারকেন্দ্রিক, পুরুষপ্রধান, নৈতিকভাবে দুর্বল, সহিংস কিন্তু একই সঙ্গে সৃজনশীল, উদ্ভাবনীশক্তিসম্পন্ন। লেখক: ফ্রিল্যান্স লেখক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী।