দশ-পনেরো মিনিট পায়চারি করেও দরজাটা দিয়ে ঢুকতে পারিনি। ওখানে যাবার আগে বুঝতে পারিনি এরকম দ্বিধায় পড়ে যাবো, আর সেটা ঠিক দরজার সামনে এসেই। জানি না কেন, তবে নিশ্চিতভাবেই সময় এখানে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। সবাই বলে সময় সবকিছু সারিয়ে তোলে, কিন্তু ঐদিন মনে হচ্ছিলো সময় শুধু সারিয়েই তোলে না, জড়তা আর দ্বিধার স্তুপও বাড়িয়ে দেয়। ঐ মুহূর্তে আমি সেই স্তুপের তলে তলিয়ে গেছিলাম।
জ্ঞান হবার পর থেকেই জানি সাহসিদের মধ্যে আমি পড়ি না, কিন্তু সামান্য একটি খোলা দরজা দিয়ে ঢোকার মতো সাহস নিশ্চয় আমার আছে, তাই এরকম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানেই ছিলো না, তারপরও সেই খোলা দরজাটি কোনো দূর্গের বিশাল আর ভারি ফটকের মতোই পথরোধ করে দাঁড়িয়ে ছিলো আমার সামনে। ভাগ্য ভালো, সমস্ত দ্বিধা আর সংকোচ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিলাম অপরিচিত একজনের হস্তক্ষেপে। লেখালেখি করে যে টুকটাক পরিচিতি পেয়েছি সেটা আবারও টের পেলাম।
ঐ খোলা দরজা দিয়ে এক যুবক বেরিয়ে আসার সময় আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। আগ বাড়িয়ে জানায় সে আমার লেখার একজন পাঠক। ভক্তদের সাথে এরকম আকস্মিক দেখা-সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা আমার জন্য অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়। তাদের আচরণ, কথাবার্তা, উচ্ছাসের সাথেও আমি পরিচিত।
করমর্দন করতে করতেই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ঐ যুবক অনেক কিছু বললো, তারপর যখন জানতে পারলো আমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছি সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো সে। কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি আমি?-তার সঙ্গত প্রশ্নের জবাবে সেই নামটি উচ্চারণ করলাম যে নামটি আমার হৃদয়ের গহীনে দীর্ঘস্থায়ী আস্তানা গেড়ে আছে দুই যুগ ধরে। খুবই আন্তরিকভাবে আমাকে লিফট পর্যন্ত পৌছে দিলো সেই তরুণ, সেই সাথে কতো তলায় যেতে হবে সেটাও বলে দিলো। এমনকি লিফটে করে আমাকে নির্দিষ্ট সেই অফিসে পৌছে দেবার আগ্রহও দেখিয়েছিলো তবে আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে.......
রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ খ্যাত লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের জন্ম ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এক বছর অধ্যয়নের পর সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তার সৃজনশীল সত্ত্বা বিকাশের উপযোগী আরেকটি বিষয় তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বাংলার পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন ভিনদেশী বিখ্যাত থ্রিলারগুলো অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে। ২৬টিরও বেশি বইয়ের এ অনুবাদক পরবর্তীতে মনোনিবেশ করেন মৌলিক থ্রিলার রচনায়। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এর বই হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ‘নেমেসিস’, যা তার মৌলিক লেখা হিসেবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। মূলত এই বইয়ের জনপ্রিয়তাই তাকে পর পর চারটি সিকুয়েল লিখতে অণুপ্রেরণা দিয়েছিলো। সেগুলো হলো ‘কন্ট্রাক্ট’, ‘নেক্সাস’, ‘কনফেশন’ এবং ‘করাচি’। মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন এর বই সমূহ এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জাল’, ‘১৯৫২ নিছক কোনো সংখ্যা নয়’, ‘পেন্ডুলাম’, ‘কেউ কেউ কথা রাখে’ ইত্যাদি। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এর বই সমগ্র এর মাঝে আজ পর্যন্ত ঠাই পেয়েছে মোট ১১টি থ্রিলার উপন্যাস। এর মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’, যা পশ্চিমবঙ্গেও সাড়া জাগিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ঢাকা এবং কলকাতা উভয় স্থান থেকেই বইটির সিকুয়েল ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো আসেননি’ ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনী থেকে বইমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনী ‘অভিযান পাবলিশার্স’ লেখকের মৌলিক থ্রিলারগুলোর ভারতীয় সংস্করণও প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি শীঘ্রই তার উপন্যাস অবলম্বনে ভারত থেকে ওয়েব সিরিজ বের হওয়ারও কথা রয়েছে। অতএব মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের রচনাশৈলীর কদর অনস্বীকার্য। অনুবাদক এবং থ্রিলার লেখক ছাড়াও নাজিমের আরেকটি পরিচয় হলো- তিনি বাংলাদেশের বাতিঘর প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক।