এরিখ মারিয়া রেমার্ক ফরাসি বংশােদ্ভব। ১৮৯৮ সালের ২২ জুন জার্মানির ওয়েস্টফেলিয়া প্রদেশের অন্তর্গত ওসনাব্রুকে তাঁর জন্ম। প্রথম মহাযুদ্ধকালে ১৮ বছর বয়সে শিক্ষাজীবন ত্যাগ করে তাঁকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে যােগদান করতে হয় এবং তিনি পশ্চিম সীমান্তের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে একাধিক বার আহত হন। ১৯১৮ সালে যুদ্ধাবসানের পর রেমার্ক এক এক করে জীবন-জীবিকার সন্ধানে কতিপয় ক্ষেত্রে বিচরণ করে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার পেশা গ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালে একটা ক্রীড়া সাময়িকীর সম্পাদক থাকাকালে তিনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস In Westen nicht রচনা করে বিশ্বে সাড়া জাগিয়ে তােলেন। অনতিবিলম্বে এই উপন্যাস ইংরেজি ভাষায় All Quiet on the Western Front নামে অনূদিত হয়, এবং তা চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়ে সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়। এই উপন্যাস আরও বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে সমাদর লাভ করে। বিশ্বসাহিত্যের সর্বাধিক সমাদৃত গ্রন্থাবলির মধ্যে এই উপন্যাস অন্যতম। যুদ্ধের নিষ্ঠুর ভয়াবহতা ও অযৌক্তিকতা আপন জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলােকে বিধৃত করে তিনি শান্তিবাদ ও মানবতাবাদের অন্যতম অকৃত্রিম প্রবক্তারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তদানীন্তন তরুণ সমাজের প্রতিনিধি। তাঁর শান্তিবাদ ও মানবতাবাদ দর্শন বিশ্ববিবেককে এমনি প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করে যে, সমরবাদী নাৎসি সরকার কর্তৃক ১৯৩৯ সালে এই উপন্যাসের সমস্ত কপি ভস্মীভূত করা হয়। All Quiet on the Western Front-এ যে-জগতের বর্ণনা আছে, তা যুদ্ধক্ষেত্রের জগৎ। ভয়াবহ যুদ্ধের অবসানে যেসব তরুণ সৈনিক মরণকে ফাঁকি দিয়ে স্বগৃহে তাদের যুদ্ধপূর্ব পরিচিত জীবনে ফিরে আসে, সেই প্রত্যাগতদের জীবনকাহিনি অবলম্বনে গ্রন্থকার ১৯৩১ সালে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস Der Weg Zeriick রচনা করেন ।
পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১৯৩৫ সালের ২রা নভেম্বর বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের টালমাটাল সময়ে পরিবারসমেত কলকাতা পাড়ি জমান। বাবার চাকরির সুবাদে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শৈশব কেটেছে তার। কোচবিহার বোর্ডিং স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন তিনি। মাধ্যমিক পাস করেন কোচবিহার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে। পরে কলকাতা কলেজ থেকে বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। শীর্ষেন্দু তার পেশাজীবন শুরু করেন শিক্ষকতার মাধ্যমে। দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেছেন কিছুদিন। বর্তমানে সাহিত্য পত্রিকা দেশ-এর সহকারী সম্পাদক পদে নিয়োজিত আছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ছোটবেলা থেকেই ভীষণ বইপড়ুয়া ছিলেন। হাতের কাছে যা পেতেন তা-ই পড়তেন। খুব ছোটবেলাতেই তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় এর মতো লেখকদের রচনাবলী পড়ে শেষ করেছেন। এই পড়ার অভ্যাসই তার লেখক সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৯ সালে দেশ পত্রিকায় তার প্রথম গল্প ‘জলতরঙ্গ’ প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ ৭ বছর পর দেশ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’। এরপর থেকেই নিয়মিত লিখতে থাকেন তিনি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর বই এর সংখ্যা দু’শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস পার্থিব, দূরবীন, মানবজমিন, গয়নার বাক্স, যাও পাখি, পারাপার ইত্যাদি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর রহস্য সমগ্র রহস্যপ্রেমীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রায় ৪০ এর অধিক রহস্য গল্প প্রকাশিত হয়েছে ‘অদ্ভুতুরে সিরিজ’ নামকরণে। মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি, ভুতুড়ে ঘড়ি, হেতমগড়ের গুপ্তধন, নন্দীবাড়ির শাঁখ, ছায়াময় ইত্যাদি এই সিরিজের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু ছোটগল্প রচনা করেছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর বই সমূহ দুই বাংলায় পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে সমানতালে। এছাড়াও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর বই সমগ্র অবলম্বনে বিভিন্ন সময় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তার উপন্যাস ‘যাও পাখি’ এবং ‘মানবজমিন’ নিয়ে বাংলাদেশেও ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হয়েছে। তার সৃষ্ট চরিত্র শাবর দাশগুপ্ত এবং ধ্রুব পাঠক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। সাহিত্যে অবদানের জন্য অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’র জন্য ১৯৮৫ সালে ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’ পান। ১৯৭৩ এবং ১৯৯০ সালে পেয়েছেন ‘আনন্দ পুরস্কার'। ১৯৮৮ সালে ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য অর্জন করেন ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’। এছাড়াও, ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ লাভ করেন তিনি।