"দেওবন্দিয়াত ও আমরা" বইয়ের ফ্ল্যাপের লেখা: আত্মসমালোচনা করতে পারাও একটি মহত গুন। যে জাতির মাঝে তা নেই, তারা কখনও সফলকাম হতে পারেনা। আত্মসমালোচনা জীবনের লক্ষ্যকে সজীব রাখে। পার্থিব জীবনে দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি করে, পরকালীন জওয়াবদিহিতার চিন্তা বৃদ্ধি করে এবং বিবেককে শাণিত করে। করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভে সাহায্য করে। সর্বোপরি জীবনের উচ্চতম লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে উঠার কাজে সর্বদা প্রহরীর মত দায়িত্ব পালন করে। ড.উমর উবাইদ হাসানা "আদাবুল ইখতিলাফ ফিল ইসলাম" বইয়ের ভূমিকায় লিখেন,"আমরা কমই আমাদের অভ্যন্তরীন বিষয়ে লক্ষ্য করি। কেননা মানুষের দোষত্রুটি নিয়ে নিয়োজিত থাকা,এর প্রচার করা এবং এর উপর পাতন,নিজেদের অভ্যন্তরীন কাঠামো এ চিন্তার সুযোগ দিচ্ছেনা। অথচ হাদিস বলে, শুভ সংবাদ ঐ ব্যক্তির জন্য, যাকে নিজের দোষত্রুটি অন্যের খুঁত অন্বেষণ করা থেকে নির্লিপ্ত রাখে। উস্তাজে মুহতারাম মুফতি সাইদ আহমদ পালনপুরি জজিদা মাজদুহু "গুলু ফিদ্বীন" বইয়ে অভিমত ব্যক্ত করে লিখেন, "অন্যদের সমালোচনার শিকার হওয়া থেকে নিজেদের দোষত্রুটি নিজেরাই বলা উত্তম"। লেখক "দেওবন্দিয়ত ও আমরা" বইটি এলক্ষ্যেই রচনা করেন। বইয়ে দেওবন্দিয়ত-এর প্রধান বিষয়বস্তু; "ইহয়াউস সুন্নাহ: সুন্নাহ প্রাণবন্ত করা। ইমহাউল বিদআহ: বিদআতের বিলোপসাধন এবং আত-তালাক্কি আনিস সালাফ: সালাফে সালেহিন থেকে দ্বীনের বিষয়বস্তু গ্রহণ করা" ও প্রাসঙ্গিক নানান বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয়। আমাদের দেওবন্দিয়ত মিশন কী, আমরা কারা, দায়িত্বভার কী? লেখক তা দলিলভিত্তিক ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রাচীন ঐতিহ্যের ইলমি শহর হিন্দুস্তানের গুজরাট প্রদেশের পালনপুর গ্রামে, বাবা ইউসুফের ঔরষে এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয় এই কালজয়ী ক্ষণজন্মা মনীষী। নির্মোহ এ বিদ্যাসাগর জ্ঞানতাপস। জন্ম তারিখ নির্দষ্টভাবে অসংরক্ষিত হলেও পারিবারিক সূত্রে যতটুকু জানা যায়, তার জন্ম তারিখ হিজরি সনের ১৩৬০ হি. ধরা হয়৷ আর এমনি মনে করতেন হজরতের ওয়ালিদে মুহতারাম৷ পিতা মৌলভি ইউসুফ রহ.-র কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা দীক্ষা অর্জন করেন৷ শুরুতেই তাঁকে গ্রামের মক্তবে ধর্মীয় তালিম তরবিয়তের জন্য বসিয়ে দিয়ে পাঠগ্রহণের সূচনা করা হয়৷ তাঁর পিতা ছিলেন ইবনে হাজরে হিন্দ আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর একনিষ্ট শাগরিদ বদরে আলম মিরাঠি র.-এর কাছের শিষ্য৷ তিনি তখন গুজরাটের ডাবিল মাদ্রাসার ছাত্র৷ ঐ সময় উক্ত মাদ্রাসায় আল্লামা শিব্বীর আহমদ ওসমানী এবং ইউসুফ বানূরি রহ. এর মতো মহান মনীষীগণ দারস তাদরিসের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। জন্মের সময় পিতা ইউসুফ রহ. ও মোহতারামা আম্মাজান তাঁর নাম রাখেন "আহমাদ"৷ এর পেছনেও রয়েছে একটা উদ্দেশ্য ও রহস্য৷ সেটা হলো--তাঁর ছিল একজন মা-শরিক ভাই, যে শৈশবকালে মারা যায়৷ নাম ছিল আহমাদ তাই তার স্মরণকে তাজা রাখার জন্যে তাঁরও নাম রাখা হয় 'আহমদ'৷ পরবর্তীতে কোন এক সময় নিজেই নিজের নামের সাথে সাঈদ যোগ করে সাঈদ আহমাদ হয়ে যান। আজো এ নামে প্রসিদ্ধ। কর্ম জীবনের শুরুতে নিজের নামের সাথে বাপের দিকে নেসবত করে ইউসুফি যোগ করেন৷ কোন কারণে নামের সাথে নিজের জন্মস্থান 'পালনপুর' এর দিকে সম্পৃক্ত করে পালনপুরি হয়ে যান। আজ অবধি সাঈদ আহমদ পালনপুরি নামে দেশে বিদেশে পরিচিত। এ নামেই খ্যাত এ বিখ্যাত মনীষী। মাজাহিরুল উলুম, সাহারানপুরে ভর্তি-- লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিজ এলাকা পালনপুর থেকে সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি ১৩৭৭ হিজরিতে সাহারানপুরের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ ভর্তি হন। যার সুনাম সুখ্যাতি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অবশ্যই মাযাহিরুল উলুম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার বছরই হয়৷ তবে দারুল উলূম প্রতিষ্ঠা হয় মহররমের পনের তারিখে আর ঐ বৎসরই রজব মাসে মাজাহিরুল উলুম প্রতিষ্ঠিত হয়৷ পালনপুরেই তিনি শরহে জামী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন৷ তারপরে তিনি মাজাহিরুল উলূম সাহারনপুরে ভর্তি হন৷ সেখানে তিনি তিন বৎসর গভীর অধ্যয়ন করে সফলতার স্বাক্ষর করেন৷ সেখানে তিনি মুফতি ইয়াহইয়া সাহারানপুরী ও মাওলানা ইয়ামীন সাহেব এবং ইমামুন নাহব ওয়াল মান্তেক সিদ্দীক আহমদ রহ. প্রমূখ মহামনীষীর কাছে বিভিন্ন ফন পড়েন৷ দারুল উলূম দেওবন্দে দাখেলা- তারপরেই মাওসুফের ভাগ্যাকাশে জীবনান্দের তারকা উদিত হয়। ১৩৮০ হি.তে দারুল উলূম দেওবন্দে সালে শশম [জালালাইন] জামাতে ভর্তি হন৷ সেখানেও তিনি অত্যন্ত সুনাম সুখ্যাতির সাথে গভীর অধ্যয়নে নিজেকে ধন্য করেন৷ সময়ের যথাযথ মূল্যায়ণ করে জ্ঞানে গুণে সবার নজর কেড়ে নেন৷ জীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী৷ ইশকে নবীকে লালন করতেন হৃদয় গহীনে৷ দারুল উলূমে তিনি হযরত নাছির আহমদ খাঁন সাহেব রহ. এর কাছে তাফসিরে জালালাইন সহ আল-ফাউযুল কাবীর ইত্যাদি কিতাবাদি দারস গ্রহণ করেন৷ পরবর্তীতে তিনি ১৩৮২ হি.তে তাকমিলে হাদিস (দাওরা জামাতে) সিহাহ সিত্যাহসহ হাদিসের কিতাবাদি পড়েন৷ দারুল ইফতায় ভর্তি-- বাবার ইচ্ছে ছিল সাঈদ আহমাদ শুধু আলেম হয়ে দ্বীনের খেদমত করবে৷ সেখান থেকে তো কোন বেতন ইত্যাদি গ্রহণ করবে না৷ তাই জীবিকা উপার্জনের জন্য ভিন্ন পেশা বেছে নিবে। আর তা হল 'হাকিম' হয়ে দারস তাদরিসের পাশাপাশি জীবিকা উপার্জন করবে৷ তাই বাপের ইচ্ছা ছিল সে জামিয়া তিব্বিয়া, দেওবন্দে ভর্তি হোক৷ কিন্তু হযরত তো ছিলেন ইলমের পাগল৷ স্বাদ পেয়েছেন কিতাব অধ্যয়নে৷ তাই তিনি বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসেন দেওবন্দে৷ এসে ১৩৮৩ তে দারুল উলুমে শু'বায়ে ইফতায় ভর্তি হন৷ তৎকালীন সময়ে দারুল উলুমের প্রধান মুফতি ছিল সাইয়্যিদ মাহদি হাসান সাহেব রহ.৷ হজরতের মোতালায়া বা অধ্যয়নের অগাধ আগ্রহ দেখে পরবর্তী বছর তাঁকে দারুল উলুমের মুঈনে মুফতি হিসাবে দারুল উলুমে রেখে দেয়৷ এর আগে কিন্তু দারুল উলুমের 'মুঈনে মুফতি'-র পদে নিয়োগ পদ্ধতি ছিল না৷