অবিভক্ত ভারত-বাংলার ব্রিটিশ পরাধীনতায়, জমিদার প্রথার বাস্তবতায় জন্ম ফুলমনির। শৈশব থেকে কৈশোরে পা দিতে দিতে সমাজ, প্রকৃতি, পুরাণ কাহিনী, ধর্মীয় অনুশাসন এসব কিছুর মিশেলে তৈরি হচ্ছিল ফুলমনির মনোজগৎ। কিন্তু মানুষের মনোজগৎ বড়োই বিচিত্র। কে, কিভাবে, কোন বিষয়কে ধারণ করে জীবনের একান্ত আরাধ্য করে সেটা বোধহয় বলা ততটা সহজ কাজ নয়। একই বাস্তবতা আর জীবনকে আমরা একেকজন একেকভাবে দেখি। সমস্যা, সমাধান, দুঃখ, সুখ একেকভাবে একেকজনের কাছে ধরা দেয়। উপন্যাসের মূল চরিত্র ফুলমনি মানবী হয়ে জন্ম নেয়। নিজেকে সে একজন শক্তিশালী মানুষ হিসেবে কল্পনা করে। মানুষের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য তার অনেক মায়া। কল্পনায় সে নিজেকে দেখে এক অসামান্য শক্তিশালী মানবিক সত্ত্বা হিসেবে। এক অদ্ভুত স্বপ্নের মাধ্যমে একদিন সে জানতে পারে, আসলেই সে সাধারণ কোনো মানবী নয়। অন্য এক অদৃশ্য ভিনগ্রহ থেকে পৃথিবীর মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখে সে নেমে এসেছে তাদের মঙ্গল করার জন্য। ‘কল্পনা’ আর ‘স্বপ্ন দরজা’ দিয়ে সে যেকোনো দিন সেই অদৃশ্য গ্রহে ফিরে যেতে পারে। কিশোর ‘শিশির’ তার আজীবনের প্রেমিক, জীবনসাথী। কিন্তু শিশির কোন মানুষ না। মানবী ফুলমনি অন্য গ্রহে ফুলকুমারী। শিশিরও পৃথিবীতে অদৃশ্য হয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওর একটাই কাজ। আর তা হচ্ছে ‘ফুলকুমারী’কে মানুষ সৃষ্ট বিভিন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করা, ফুলমনিকে কোন বিপদ আসার আগে সতর্ক করা। পৃথিবীর সবকিছু ফুলমনির ভালো লাগলেও, একদিন সে টের পায়, মানুষ আসলে এক জটিল প্রাণী। মানুষ নিজের দুঃখ কষ্ট নিজেই সৃষ্টি করে। এক শ্রেণির মানুষ অন্য শ্রেণিকে পীড়ন করে। যেহেতু ফুলমনি আসলে মানবীর ছদ্মবেশে এক ভিনগ্রহের 'অচিন জীব' বা 'এলিয়েন', সে চাইলেই নিজের ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কাছের মানুষদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের দুর্ভিক্ষ, ইংরেজি শাসন শেষ হবার আগের দাঙ্গা এবং ভারত-বাংলা ভাগ হয়ে ভারত, পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) হবার মুহুর্ত গুলোতে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন, জমিদারী প্রথার বিলুপ্তি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিচ্ছেদ, হিন্দু-মুসলমান বিরোধ, মানুষের দেশান্তরী হবার মত মর্মস্পর্শী সব ঘটনার মধ্য দিয়ে মূল চরিত্র 'ফুলমনি' (পরীরাজ্যের ফুলকুমারী) বড় হতে থাকে। "গডমাদার" বিশেষণটি এখানে শক্তিশালী নারীর জন্য। একাধিক নারী চরিত্র এই উপন্যাসে নারীর সমস্ত শক্তিকে তুলে ধরার চেষ্টায় একটি ক্যানভাস। যুথবদ্ধ মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে শুরু করে পরিবার প্রথায় পৌঁছে আজকের নারী-পুরুষ সম্পর্কে যে বিচিত্র পরিবর্তনগুলো তৈরি হয়েছে তা যেন পাঠক তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন এমনটাই ঔপন্যাসিকার প্রচেষ্টা। তিন পর্বের এই উপন্যাসের এটিই প্রথম পর্ব। আমি এর সর্বাত্মক সাফল্য কামনা করি।
জহরত আরা ১৯৬৮ সালের ৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলায় মামাবাড়িতে জন্ম। ইংরেজি সাহিত্যে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তাঁকে জুগিয়েছে বাংলা সাহিত্যে লেখালেখির প্রেরণা। এই পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়টি। প্রথম উপন্যাস গডমাদার (২০২৩) প্রথম কাব্যগ্রন্থ। পাখিদের মিছিলে (২০২০)। দুই সন্তান ঋষা আহমেদ, ঋদ্ধ আহমেদ ও স্বামী শিক্ষাবিদ সবুজ আহমেদকে নিয়ে তার সংসার। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় 'রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা'র ইংরেজি বিভাগে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। সাহিত্যের শিক্ষক এবং গবেষক জহরত আরা দীর্ঘদিন দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থায়ও কাজ করেছেন। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ। নোরাড স্কলারশিপ পেয়ে 'শান্তি গবেষণা' বিষয়ে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেছেন নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম এমফিল ডিগ্রি অর্জন করার গৌরব অর্জন করেন তিনি।