অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক-এর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ পলিটিক্যাল পার্টিস ইন ইন্ডিয়া-এর বাংলা অনুবাদ ভারতের রাজনৈতিক দল। উপনিবেশিক আমলে উপমহাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা কীভাবে চর্চিত হতো এবং হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উদ্ভব ও ফলাফল সন্ধান অধ্যাপক রাজ্জাকের অন্যতম আগ্রহের জায়গা।
অধ্যাপক রাজ্জাক এই গ্রন্থে উপনিবেশিক ইতিহাসকে যে প্রেক্ষাপট থেকে দেখেছেন, তা একইসাথে ছিল অভিনব ও যুগান্তকারী। উপনিবেশিক আমলাতন্ত্র প্রায় স্বতন্ত্র সত্ত্বা হিসেবে ভূমিকা রেখে পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনীতির গতিপথ যে নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা অধ্যাপক রাজ্জাকই এই গ্রন্থে সম্ভবত প্রথম পূর্ণাঙ্গরূপে উপস্থাপন করেছেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের মনের বিকাশ ও রাজনৈতিক ভূমিকা বিষয়ে অধ্যাপক রাজ্জাকের বিশ্লেষণ পরবর্তীকালের চিন্তাবিদদের ওপর বিপুল প্রভাব রেখেছে। উপনিবেশিক আইনি কাঠামোর ভেতরে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্ম ও বেড়ে ওঠার বাস্তবতা অধ্যাপক রাজ্জাক যেভাবে দেখিয়েছেন, সেটাও আমাদের ইতিহাসকে নতুনভাবে মূল্যায়নে বাধ্য করবে।
উপমহাদেশের উপনিবেশিক আমল কতভাবে আমাদের বর্তমানকেও প্রভাবিত করছে, সেই উপলব্ধিটি গভীরতর হবে এই গ্রন্থটি পাঠে। এই কারণেই গবেষণাটি সম্পন্ন হবার প্রায় পঁচাত্তর বছর পর গ্রন্থাকারে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশ পেলেও এর তাৎপর্য মলিন হয়নি একদমই, বরং এই গ্রন্থটি আজও অজস্র নতুন চিন্তাসূত্র উন্মোচন করতে সক্ষম।
অধ্যাপক রাজ্জাক (১৯১৪-২৮ নভেম্বর ১৯৯৯) গভীরমাত্রায় তাঁর সমসাময়িক ও পরবর্তীকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করেছেন। নিমগ্ন অনুসন্ধানী ও ধ্যানী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ভারতের রাজনৈতিক দল গ্রন্থটি থেকে সেই ছাপ কোথায় কোথায় এবং কোন মাত্রায় উপস্থিত, সেটা যেমন পাঠক বারংবার অনুভব করবেন, তেমনি আজকের রাজনীতি, প্রশাসন ও আমলাতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা এবং সমাজসম্পর্ক বিষয়ে উৎসুক গবেষক ও পাঠক পাবেন নতুনতর দিগন্তের হদিস।
রাজ্জাক ১৯১৪ সালে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার পাড়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আব্দুল আলি একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি ঢাকার মুসলিম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৩১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর পাস করেন। তিনি লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে পিএইচডি করার জন্যে লন্ডন গমন করেন; তবে লাস্কি পরলোকগমন করায় তাঁর থিসিস মূল্যায়ন করার মতো কেউ নেই এই বিবেচনায় তিনি থিসিস জমা না-দিয়েই (অর্থাৎ কোনো ডিগ্রি ছাড়াই) দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত ছিল বিশেষত প্রাশ্চ্যতত্ত্ব, ইতিহাস ও রাজনীতিতে। তিনি 'শিক্ষকদের শিক্ষক' হিসেবে অভিহিত হতেন। তাঁর অনুগামীদের মধ্যে শুধু বুদ্ধিজীবী নয়, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন। ১৯৩৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে এ বিভাগ থেকে অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান দুটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। পদোন্নতির আবেদন করতেন না বিধায় তিনি দীর্ঘকাল জ্যৈষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন।