সময়ের আলোচিত তারুণ্যের কবি, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, নবীনদের আইডল সদা হাস্যোজ্জ্বল সবার প্রিয় অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দের সম্প্রতি প্রকাশিত কবিতার বই 'উজান পাখির চোখ'। বইটির নাম শুনেই আমার মনে হলো আমিও বই সম্পর্কে দু'চারটি কথা লেখা প্রয়োজন। অবশ্য আরো কারণ আছে, আমি তাঁকে দেখেছি নব্বইয়ের দশকে 'প্রত্যাশা প্রাঙ্গন' সাহিত্য আসরে। তখন মল্লিক ভাই তাঁকে অত্যাধিক গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করতেন। পরে জানলাম তিনি তখনই একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তখন থেকে তাঁর লেখা বই পড়ে আসছি তার একজন ভক্তও বলা যেতে পারে। সেই স্থান বইটি নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করা।
বইয়ের নাম 'উজান পাখির চোখ' করার মধ্যে একটা বিচক্ষণতা আছে। উজান পাখির কাজ কি? উজান মানে চোখ উজান মানে জোয়ার উজান মানে গতি। স্রোতে অনেক কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অনেকে অনেক কিছু হারায় সেই অর্থে সকলকে সতর্ক থাকার লক্ষ্যে তাঁর এই নামকরণ করা। অথবা প্রতিকূলে থেকে পাখি যেমন সব কিছু দেখে এবং উপভোগ করে তেমনি এই কবিতায় দূর থেকে সব কিছুকে দেখে দর্শন প্রকাশ করা হচ্ছে। হতে পারে একান্তই মনের কথা বলার জন্য মানুষ যেমন মঞ্চে বা চূড়ায় উঠে বক্তব্য দেয় তেমনি তিনিও মনোযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
স্যারের প্রায় বাইশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ, গান, গবেষণা, ভ্রমণ বিষয়ক বইও রয়েছে। তাঁর লেখাগুলো স্রোতের ন্যায় মানুষের হৃদয়ে আশার আলো ছড়িয়ে দেয়, তাতে রয়েছে সম্প্রীতি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। রয়েছে ইতিহাস ঐতিহ্য, পাঠক মুগ্ধ করার মতো শব্দ চয়ন। মজার বিষয় হলো- তাঁর লেখার মূলভাব পাঠকের হৃদয়ে সুরমার মাতো সর্বদা সুগন্ধি বিতরন করে।
আলোচ্য বইতে ৬৪টি কবিতা রয়েছে। অধিকাংশ মুক্ত ছন্দে রচিত হয়েছে। কবিতাগুলো সমসাময়িক, স্যার নিজেই মন্তব্য করেছেন, সময়কে ধারন করেই বইটি সাজিয়ে নেবার প্রয়াস চালানো হয়ে়ছে। তাঁর লিখিত
প্রায় কবিতায় শেকড়ের ঐতিহ্যে ফেরার আহবান করা হয়েছে। এবার বইয়ের
প্রথম কবিতাটির নাম 'একফোঁটা প্রেম' উক্ত কবিতায় স্বপ্নের মতো প্রেম উড়ে উড়ে সাগর পাহাড় সমতল পেরিয়ে নবী রাসূল সাহাবাগণের পথ ধরে হাজার বছরের রাহবারদের পথ ধরে ঐতিহ্য ছুঁয়ে হাজার মাইল দূরের মক্কা মদীনায় পৌছেছে মানুষের প্রেম। তারপর কাতর স্বরে কায়মনোবাক্যে বলে 'আমি তোমার দিদারে দেওয়ানা প্রভু হে' তখন নিষ্পাপ শিশুর মতো ঝলমলে হয়ে ওঠে মন। কি আকুতি সেখানে। যেন সব হৃদয়ের তামান্না সেখানে সেই মদীনায়।
'দ্বিপদ দ্বিমত' কবিতার শেষ দুটি লাইন বন্ধুদের না জানালে চমকটা থেকেই যায়। যেমন-
'হতাশার ঝরাপাতা আগুনে পোড়াও
বিশ্বাসে সাহসের পাতাকা আগুনে ওড়াও'।
কবির চেতনা বিশ্বাস ও সাহসিকতা এই একটি পদেই পরিলক্ষিত হয়। এভাবে পর্বে পর্বে তিনি স্বীয় বিশ্বাসের ঐকান্তিক পরিচয় দিয়েছেন বিভিন্ন কবিতায়।
'আরাধ্য ফসিল' কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রচনা করেছেন- আজকাল সবাই সিংহাসন পেতে চায় পিয়ন থেকে কেরানী, সুইপার থেকে চৌকিদার, সবার চোখেমুখে সিংহাসনের স্বপ্ন;
ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা চাই।
হিমায়িত চোখে কবিতায় সমসাময়িক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন- জীবনের ছবি আঁকতে আঁকতে রুদ্ধ গলিতে হাঁটতে হাঁটতে পা ফ্যালে লাশকাটা ঘরের শেষ ফটকে
অবশেষে হেসে উঠেন আরশ জমিনের মালিক' একটি সুক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরেছেন কবি। বিভিন্ন কবিতায় কখনো কখনো কোরানের আয়াতগুলো ইঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন কবিতায় ইসলামের প্রচার প্রসার হচ্ছে, কোথাও আশার আলো কোথাও পথ নির্দেশনাই এর মূলভাব। একইভাবে 'আরাধ্য নিশান' কবিতায় সকল কিছু যে আল্লাহর নিকট মাথা নত করে তার একটা চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে- ' ফলবান বৃক্ষরাও আগাছা লতার কাছে সঁপে দেয় বুকের সম্পদ, গৃহকর্তা নীরব অশ্রুতে সিক্ত হয়'। কবিতার শেষে প্রার্থনা করেছেন - 'রহমের বৃষ্টি ঝরাও হৃদয়ে হৃদয়ে
খুলে দাও সাহসের বন্ধ দুয়ার'। চমৎকার শব্দ গেঁথে গেঁথে তিনি রহমের বৃষ্টি ঝরিয়েছেন।
নীলকন্ঠের কাব্যকলা কবিতায় সময়ের প্রতিবাদ আসে এভাবে- 'কষ্টের হেমলকে সাজিয়ে দিচ্ছো আমার কলিজারঙ,খয়েরি গোলাপ, রুদ্ধশেলে বন্দি করছো আমার কলমের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর'। সময়ের পাতায় পাতায় এঁকে যাচ্ছো ধূসর পান্ডুলিপি।
ফেনিল স্বপ্নশৈলী কবিতায় সবুজ সংকেত দিয়েছেন এভাবে-
আশার সংকেত খুঁজি
মাড়িয়ে চলি সম্ভাবনার বাউড়ি বাতাস
কচি ফসলে দোল দিয়ে এগিয়ে চলা বাতাসের মতো
ভেতরটা নড়েচড়ে ওঠে
জীবন বাশিতে ওঠে ভৈরবী সুর
নতুন চরের পূর্বাভাস।
কবি আশার আলো খুঁজেছেন আরো কিছু কবিতায়।
কোথাও লিখেছেন- জোছনা চাই, চাই আলোকের সাহসী উম্মিলন। কোথাও লিখেছেন- হার মানবেনা লড়াকু মনের কবিতা সখি। কোথাও লিখেছেন - পুষ্প, আর কতোকাল অপেক্ষা তোমার!
তাঁর প্রতিটি কবিতার শব্দ চয়ন তাঁকে আলাদা করে দেয় অন্যান্য কবিদের থেকে। আমার মনে হয় তিনি স্বতন্ত্র তিনি একক।
যুগলবন্দী কবিতার কয়েকটি পদে এভাবে এসেছে শব্দগুলো -
সময় চলেছে শান্তনার শ্লোগানে শব্দহীন নীরব ডানায়
'যুগের পীঠে ভর দিয়ে চলে গেছে দশকের হিসেব নিকেশ
স্বপ্নরা তখনও উচ্ছ্বাসের ঘোড়ার খোঁজে
ভালোবাসার খরানো মাঠে সতেজতার অন্বেষণে।'
একটু পরেই আবার লিখেছেন- "প্রেমের খেলায় নাম লিখেছো নূপুর ভাঙো
ফুটাও কাঁটা কোমল পায়ে।"
ক্ষান্ত হবার সুযোগ নেই, ব্যস্ততা ও কর্মের ভিতরেই শান্তি। তা যদি ধরে রাখা না যায় তবে ব্যর্থতা তাচ্ছিল্য
স্বপ্নখেলা কবিতায়- স্বপ্নখেলায় হেরে গেলে চলে না রে পারু
হৃদয়ের ক্ষতে সুবাস মাখানো খুব কঠিন
তবুও ফুল ফুটানোর স্বপ্ন জাগে বলেই
হেসে ওঠে করোনাকুজো পৃথিবী।
পাঠক নিশ্চয়ই তাঁকে বুঝতে পেরেছেন। আসুন শীতল ছায়াতলে তাঁর কাব্য পাঠে মত্ত হই।
- অবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন ( কবি ও লেখক)