দেবযান উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য প্রেম। এই উপন্যাসে লেখক প্রথাগত ঈশ্বরসম্পর্কিত অনেক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। কিন্তু এই সবকিছুকে ছাড়িয়ে দেবযান উপন্যাসে প্রধান হয়ে উঠেছে বিভূতিভূষণের নিজস্ব ঈশ্বরানুভূতি। তবে ঈশ্বরানুভূতিই এ উপন্যাসের একমাত্র বিষয় নয়, সপ্তস্তরবিশিষ্ট যে দেবলোকের কল্পনা করেছেন লেখক, তার মধ্য দিয়ে বিভূতিভূষণ সুখদুঃখময় এই মাটির পৃথিবীকেই যেন বিহঙ্গ-দৃষ্টিতে অবলোকন করতে চেয়েছেন। বিভূতিভূষণ এই মায়াময় জগতের প্রতি যে গভীর আসক্তি পোষণ করেন, তার ফলেই দেখা যায় স্বর্গ-মর্ত্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে উপন্যাসে। দেবযান উপন্যাসে বিভূতিভূষণ স্বর্গের দূর সীমানাকে যেন মর্ত্যরে মায়ায় এনে একীভূত করে ফেলেছেন।
গ্রামের প্রান্তে এক ভাঙা দুর্গের রহস্যঘেরা পরিবেশ কেদার রাজা (১৯৪৫) উপন্যাসে অসাধারণ রূপ লাভ করেছে। কাহিনির বিস্তৃতি ও আয়তন অনেক বেশি হলেও উপন্যাসটি গ্রন্থিবহুল নয়। মূলত গ্রাম ও কলকাতা―এই দুই ভাগে কাহিনির বিস্তার ঘটলেও শেষ পর্যন্ত পাঠককুল গ্রামজীবনের পটভূমিকায় প্রত্যাবর্তন করে সুস্থিত হয়। উপন্যাসে দুটি প্রধান চরিত্র―পিতা কেদার আর বিধবা তরুণী কন্যা শরৎসুন্দরী। প্রাণের ভাষার ব্যঞ্জনায় বিভূতিভূষণ গ্রামের উপান্তের এমন এক রহস্যের সন্ধান দিয়েছেন, যা আমাদের বিমুগ্ধ করে রাখে।
ছোটদের জন্য বিভূতিভূষণের লেখা চতুর্থ অভিযানমূলক কাহিনি হীরামানিক জ্বলে। এই কাহিনির নায়ক সুশীল পথের ইশারাতেই সুদূর সুলুদ্বীপে পৌঁছে যায় আবিষ্কারের নেশায়।
অথৈ জল উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য কিশোরী পান্নার প্রেম। কোনো কোনো সমালোচক এই উপন্যাসকে ‘নেহাতই এক পদস্খলনের কাহিনি’ বলে মনে করেছেন। কিন্তু অথৈ জল কেবল পদস্খলনের আখ্যান নয়, আবার একে পরকীয়া প্রেম বলেও আখ্যায়িত করা যায় না।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কিছু কালজয়ী উপন্যাস রচনার মাধ্যমে জয় করে নিয়েছেন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের হৃদয়। শুধু উপন্যাসই নয়, এর পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন বিভিন্ন ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, দিনলিপি ইত্যাদি। প্রখ্যাত এই সাহিত্যিক ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল যশোর জেলায়। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর প্রথম বিভাগে এনট্রান্স ও আইএ পাশ করার মাধ্যমে। এমনকি তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। সাহিত্য রচনার পাশাপশি তিনি শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই সমূহ এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো 'পথের পাঁচালী', যা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়ার মাধ্যমে। এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় অর্জন করেছেন অশেষ সম্মাননা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই এর মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো 'আরণ্যক', 'অপরাজিত', 'ইছামতি', 'আদর্শ হিন্দু হোটেল', 'দেবযান' ইত্যাদি উপন্যাস, এবং 'মৌরীফুল', 'কিন্নর দল', 'মেঘমল্লার' ইত্যাদি গল্পসংকলন। ১০ খণ্ডে সমাপ্ত ‘বিভূতি রচনাবলী’ হলো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই সমগ্র, যেখানে প্রায় সাড়ে ছ’হাজার পৃষ্ঠায় স্থান পেয়েছে তার যাবতীয় রচনাবলী। খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর বিহারের ঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর 'রবীন্দ্র পুরস্কারে' ভূষিত হন।