ইছামতী বিভূতিভূষণের শেষতম উপন্যাস। তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসের মতো ইছামতীতেও দুটো প্রেরণা বা বিষয় মুখ্য হয়ে উঠেছে―একটি জীবনপ্রবাহ ও অপরটি কালপ্রবাহ। অন্নদাশঙ্করের ভাষায় ইছামতী ‘কালপ্রবাহের প্রতীক’, তিনি এই নদীকে ‘জীবনপ্রবাহের প্রতীক’ও বলেছেন। যে নীলকুঠিতে একদা নালুর প্রবেশাধিকার ছিল না, অর্থবিত্তের অধিকারী হয়ে অদম্য নালুপাল শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের সেই কুঠি ক্রয় করে নেয়। এই অর্থে নালুপাল ইছামতী উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রগুচ্ছ থেকে বিপরীতকল্প।
বিষয়বস্তু ও কাহিনিবিন্যাসের স্বাতন্ত্র্যে দম্পতি বিভূতিভূষণের এক ভিন্ন ঘরানার উপন্যাস। গদাধর নামক ব্যক্তির নানা ব্যবসাপ্রয়াস এবং তার স্ত্রী অনঙ্গমোহিনীর দাম্পত্যজীবনের ব্যর্থতা ও শূন্যতাই দম্পতি-র উপজীব্য।
বিভূতিভূষণ সুন্দরবনে সাত বৎসর উপন্যাসের শেষের দিকের অধ্যায়গুলো রচনা করেন। প্রমত্তা পশোর নদীর সঙ্গে লড়াই করে তীরবর্তী মানুষের বেঁচে থাকার মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা বিবৃত হয়েছে কাহিনিতে। সমগ্র কাহিনিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে কাছিমমারির চরের নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধের কথা। তার জীবনবোধের সারল্যই এ উপন্যাসের মহত্তর দিক।
‘পঞ্চাশের মন্বন্তরের’ (১৩৫০) পটভূমিকায় লেখা অশনি-সংকেত উপন্যাসে দুর্ভিক্ষে উজাড় হয়ে যাওয়া বাংলার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ধরা পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মানবসৃষ্ট এই মন্বন্তরে উজাড় হয়ে যায় বাংলার গ্রামাঞ্চল। বিভূতিভূষণ অনঙ্গসুন্দরীকেন্দ্রিক এক ব্রাহ্মণ পরিবারের দৈনন্দিন চালচিত্র বর্ণনার সূত্রেই উন্মোচন করেছেন গ্রাম্যজীবনের সামাজিক ও আর্থিক বাস্তবতার ছবি। গ্রামের এই সামগ্রিক পরিচায়নের সমান্তরালে ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণের উত্থানের ইতিহাসটিও অকপটে প্রকাশ পেয়েছে। সনাতন সমাজের প্রথাগত জাতপাতের নানাবিধ সংকীর্ণতাকে অতিক্রমণের দৃষ্টান্ত এ আখ্যানে রয়েছে। মতি মুচিনীর শবদেহটি অনাদরে মাটিতে পড়ে থাকলে অনঙ্গ বউ তার সৎকারের কথা বলে। শেষ পর্যন্ত দুর্গা ভট্টাচার্য, গঙ্গাচরণ এবং কাপালীদের ছোটবউ ছুটকি মিলে মতি মুচিনীর শব বহন করে। প্রবল এক মন্বন্তর এসে ব্রাহ্মণ-শূদ্র-অচ্ছুতের ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দেয়। তবে অন্যদের ছাপিয়ে অশনি-সংকেত উপন্যাসে অনঙ্গ বউ চরিত্রটি উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে এবং এই ঔজ্জ্বল্যের মূলে রয়েছে তার সাহস, দৃঢ়তা এবং মানুষকে ভালোবাসার অপার ক্ষমতা।
অনশ্বর উপন্যাসটি বিভূতিভূষণ শেষ করে যেতে পারেননি। অনশ্বর উপন্যাসে বিভূতিভূষণের পিতৃস্নেহের আভাস উপেক্ষণীয় নয়। পিতাপুত্রের এই অকৃত্রিম স্নেহ-ভালোবাসা ও গভীর অনুভবকেই হয়তো লেখক অনশ্বর বলে মনে করেছেন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কিছু কালজয়ী উপন্যাস রচনার মাধ্যমে জয় করে নিয়েছেন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের হৃদয়। শুধু উপন্যাসই নয়, এর পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন বিভিন্ন ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, দিনলিপি ইত্যাদি। প্রখ্যাত এই সাহিত্যিক ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল যশোর জেলায়। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর প্রথম বিভাগে এনট্রান্স ও আইএ পাশ করার মাধ্যমে। এমনকি তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। সাহিত্য রচনার পাশাপশি তিনি শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই সমূহ এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো 'পথের পাঁচালী', যা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়ার মাধ্যমে। এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় অর্জন করেছেন অশেষ সম্মাননা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই এর মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো 'আরণ্যক', 'অপরাজিত', 'ইছামতি', 'আদর্শ হিন্দু হোটেল', 'দেবযান' ইত্যাদি উপন্যাস, এবং 'মৌরীফুল', 'কিন্নর দল', 'মেঘমল্লার' ইত্যাদি গল্পসংকলন। ১০ খণ্ডে সমাপ্ত ‘বিভূতি রচনাবলী’ হলো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই সমগ্র, যেখানে প্রায় সাড়ে ছ’হাজার পৃষ্ঠায় স্থান পেয়েছে তার যাবতীয় রচনাবলী। খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর বিহারের ঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর 'রবীন্দ্র পুরস্কারে' ভূষিত হন।