'ডারউইন থেকে ডিএনএ এবং চারশো কোটি বছর' লেখার পর বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে বিজ্ঞান লেখা ও প্রথাগত সাহিত্য এই দুটি ধারা সাধারণত কীভাবে পাঠকসমাজ নিয়ে থাকেন সে বিষয়ে কিছু খোঁজখবর করি। দেখলাম যে, বিদ্বৎ সমাজে মোটামুটি দু'টি প্রধান ভাগ আছে। একদল সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব অর্থাৎ humanities-এর ক্ষেত্রে বিচরণ করেন; অন্য দলের মনের ক্ষুধা তৃপ্ত হয় বিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে। দ্বিতীয় দল সংখ্যালঘু। এমন নয় যে, সাহিত্যিকদের মধ্যে যিনি কবিতা লেখেন তিনি দর্শনেও পণ্ডিত; এও নয় যে, বিজ্ঞানমহলে যিনি নক্ষত্র-গবেষক তিনি একই সঙ্গে মৎস্য-বিজ্ঞানী। কিন্তু, সাহিত্যিকদের মধ্যে পারস্পরিক ভাবের আদানপ্রদান যেমন সহজে হয়, ঠিক অনুরূপ বিজ্ঞানীদের মধ্যে এঁরা পরস্পরের যুক্তি বোঝেন। অথচ, দু'দলের মনের তার এতই ভিন্ন সুরে বাঁধা যে, এদের যুগলবন্দি সচরাচর শোনা যায় না। সাহিত্যিকদের আসরে বিজ্ঞানীরা সাধারণত ঘেঁষেন না এবং উলটাপুরাণও সাধারণত অচল। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, যেমন সংগীতানুরাগী উভয় দলেই আছেন।
সাহিত্য ও বিজ্ঞানের এই বিরুদ্ধ ভাবধারার উৎস পশ্চিমা জগতেই সৃষ্টি হয়েছিল, যখন philosophy থেকে সন্তানতুল্য natural philosophy আলাদা
হতে শুরু করে। কোপারনিকাসের সময় থেকে প্রথম দু'শ বছর পাশ্চাত্য
বিজ্ঞান ভীরু পায়ে এগিয়েছিল। তারপর মোটামুটি ডারউইনের সময় থেকে,
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি দুটি দলের আড়াআড়ি ভাবের বিকাশ দেখা যায়।
কারণ, ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীদের কয়েকটি লেখা তখনকার বাজার মাত করেছিল।
ডারউইনের অনুরাগী ভক্ত ও বিখ্যাত হাক্সলে পরিবারের প্রবর্তক থমাস হাস্কলে
(Thomas Huxley) এই আড়াআড়ির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে।
তিনি ক্লাসিক সাহিত্যের সমর্থকদের উদ্দেশ করে বললেন, কৃষ্টির (culture) একটি অঙ্গ হলো বিজ্ঞান। যার চর্চা মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, অথচ এরই ফলে সার্বিক জাতীয় উন্নতি সম্ভব হচ্ছে। অতএব বিজ্ঞান বিষয়ে সাহিত্যিকদের সাধারণ অনীহা অযৌক্তিক এবং অদূরদর্শিতার লক্ষণ।