না, শেষ পর্যন্ত ফেরদৌসিকে পাইনি। চাওয়া-পাওয়ার ঘোরতর স্বপ্নের ভেতর কখন যে না পাওয়াটা ভিড়েছিল তার হিসেব করতে পারিনি আজও। আর কেনই বা পাওয়া জিনিস না পাবার প্রকাশিত শব্দে হাই তুলবে হৃদয়ের বন্দরে। সত্য হয়তো ঠিক ঠিক এমন, না হলে ফেরদৌসি কেন এমন অসম অন্যায়ের সমতলে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে। জীবন এবং জগতের বোধ থেকে মাঝে মাঝে নিজেকে আলাদা করতে পারি না। না পারার অসহ্য যন্ত্রণা বড় অব্যক্ত থাকে, বড় পীড়া দেয় আজকাল। এই যে শব্দগুলো ব্যবহার করছি তা কিন্তু আমাকে চেনার বিপরীত সব। সময় ভেদে শব্দের তাৎপর্য কোনো সময় নিরর্থক হয় না কখনো, কখনো না।
ফেরদৌসির সাথে চেনা বিগত কয়েক বছরের আগের কোনো একটি দিন। প্রথমে ফোনালাপ, তারপর কোনো আত্মীয়ের অসুস্থতাজনিত কারণে মেডিকেলে আসা, ফোনে নক করা আর বসন্তের কোনো এক আগুনঝরা রোদ মাড়িয়ে যখন ফেরদৌসির মুখোমুখি তখন দুপুর গড়িয়ে সময় পাড়ি দিয়েছে বিকেলের দিকে। ততক্ষণে অসুস্থ আত্মীয়ের রিপোর্ট চলে এসেছে। সেই দিন বিদায়ের পর্বে চটুল ফেরদৌসির চুলের জুটি মুগ্ধতার রেশ নিয়ে এসেছিল। আর মুখের সুন্দর হাসি। যে হাসির প্রশংসা পরে অনেকেই করেছিল। সে করার কারণেই হয়তো নিজ ভালোলাগাটা ছিল সর্বোচ্চ। সেদিনটিকেই প্রেম বলেছি আমি। সেটিই প্রথম প্রেম আমার, হয়তো সেটিই শেষ প্রেম হতে পারতো? কিন্তু শেষ বলে তো পৃথিবীতে কিছু নেই। সে না থাকার অন্তরাত্মায় বারবার জ্বলজ্বল করে ফেলে আসা কাঁঠালচাঁপা বনের আর্তনাদ। আর্তনাদ বসন্তের কোকিলের রোদনকে আরও বিস্ময়াবিষ্ট করে। দীর্ঘ দিবস আর রজনীর ভেতরে শুধু পড়ে থাকে অদৃশ্য অথচ অস্পষ্ট কিছু মায়ার জগত। যেখানে শুধু বসবাস করেছিলাম আমরা। আমি আর ফেরদৌসি। প্রথম দিনের পর কত দিন কেটে গেছে। হয়তো এক যুগের মতো সময়ও কিন্তু ফেরদৌসির মুখের সেই হাসির ঢেউ হৃদয়ে যে দোলা দিয়েছিল তা প্রথমেই কক্সবাজারের সাগর পাড়ে আলোড়ন তুলেছিল মোবাইল ভেসে গিয়ে। বহুদূর থেকে ভেসে আসা হাসির রেশ যখন সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে একাকার হয় তখন আর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই হাতের মোবাইল ছেড়ে দিই। সমুদ্রের ঢেউয়ে উদযাপিত হাস্যরসের পটভূমিকায় ফেরদৌসির হাসি দীঘল রাত্রির এক অনবদ্য কাব্য। জৈষ্ঠের কোনো এক একান্ত দুপুর আমাদের ঘিরে ধরে চা বাগানের ভেতর ক্রমশ। আর যখন মনে হতে থাকে আমরা যোজন যোজন দূরত্বে থেকেও কখন কাছাকাছি চলে এসেছি তার চারপাশে তখন প্রজাপতির স্লোগানে স্লোগানে মিছিল। সে মিছিল ভালোবাসার, সে মিছিল কাছে আসার।
তারপর কত দিন কেটে গেছে আরও। মোবাইলে কথা আর চ্যাটের ভেতর গেঁথে যাওয়া হৃদয় হাসতে থাকতে কোনো এক বর্ষার বৃষ্টিস্নাত বিকেলে ফাল্গুনীর ছোট্ট সেই অবয়বে। ফেরদৌসি কেবল আমাকেই বুঝে না, সময়ের কড়ায়গণ্ডা হিসেব করে করে বুঝতে চায় আমার চারপাশ। তার চোখের তৃপ্তির ভেতর স্বপ্নের রঙ ডানা মেলে আমার। ভালো লাগতে শুরু করে আরও। সে ভালোলাগার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। কিন্তু এক ধরনের দেয়াল থেকে যায় ফেরদৌসির সঙ্গে। ভালোলাগার সমপরাবৃত্তের খোঁজ কোনোদিন পায়নি ফেরদৌসি। এই না পাবার দীর্ঘ অভিমানই কি প্রেমের চিরকালীন সৌন্দর্যের কাছ থেকে তাড়িয়েছিল ফেরদৌসিকে?...