মনীষা ডক্টর আহমদ শরীফ তাঁর ‘সংস্কৃতি। গ্রন্থে নানা স্থানে যৌক্তিক দৃষ্টবাদের আলোকে উল্লেখ করেছেন যে, ‘নৃবিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞায় সংস্কৃতি হলো অর্জিত আচার-আচরণ। কিন্তু অর্জিত আচরণেই সংস্কৃতি শব্দের নির্যাস বা তাৎপর্য মেলে না। এ অর্থে নৃবিজ্ঞানীরা মানুষের আত্মশক্তির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রয়োগকে বলেন অর্জিত আচরণ। এই অর্জিত আচরণ দিয়েই মনুষ্যসংস্কৃতি-সভ্যতার শুরু। বর্তমানের কালের সংস্কৃতিই কালান্তরে সভ্যতা নামে অভিহিত হয়। মানুষের ভাব-চিন্তা-কর্ম-আচরণ মাত্রই মানুষের মেধা-মগজের দান। কাজেই জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-মনীষীর আবিষ্কার-উদ্ধাবন সৃষ্টিই জনগণের অনুকরণে অনুসরণে আচারে-আচরণে চিন্তায়-চেতনায় দৃঢ়মূল হয়ে দৈশিক, জাতিক, বার্ণিক, ভাষিক, ধার্মিক, চর্যায়, চর্চায়, পালা-পার্বণে রূপায়িত ও প্রচলন হয়ে স্থানিক, কালিক, জাতিক সংস্কৃতি-সভ্যতা নামে হয় পরিচিত।
শৈশবে বাল্যে-কৈশোরে পরিবার-পরিবেশ-সমাজ থেকে প্রাপ্ত ও শ্রুত বিশ্বাস-সংস্কারই সাধারণভাবে মানুষের সারাজীবন নিয়ন্ত্রণ করে। আদি অজ্ঞ মানবগোষ্ঠীর কাছে আকাশের নক্ষত্র থেকে মাটির দূর্বা অবধি সবকিছু যখন অপরিচিত ছিল তখন তার স্রষ্টার অনুমানই উদ্ভব ঘটিয়েছে সর্বপ্রাণবাদের, যাদুবিশ্বাসের, ট্যাবু-টোটেম তত্ত্বের, সৃষ্টি পত্তনতত্ত্বের, অলৌকিক-অলীক-অদৃশ্য শক্তির, নিয়তির, ভয়-ভক্তি-ভরসার উপাস্য-পূজা অরি-মিত্রশক্তির- যা প্রাজন্মক্রমিক চর্চায় সংস্কারে অবিমোচ্য হয়ে বিশ্বাস রূপে হয়েছে দৃঢ়মূল। মানুষের সংস্কৃতির প্রধান উৎস ঈশ্বর-প্রোক্ত ধর্মশাস্ত্র ও তার আনুষঙ্গিক নীতিনিয়ম, রীতি-রেওয়াজ, আচার-আচরণ এবং পালা-পার্বণ।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল স্রোতের মানুষের পাশাপাশি সংখ্যালঘিষ্ঠ আদিবাসী মানুষদেরও রয়েছে উল্লিখিত ধর্ম বিশ্বাস ও নিজস্ব লোক সংস্কৃতি। বাংলাদেশে প্রায় পঞ্চাশটির অধিক আদিবাসী জাতিসত্তা- যাদের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও নিজস্ব লোক সংষ্কৃতি। যা আবহমান কাল ধরে নিজ নিজ প্রাচীন ঐতিহ্য সম্ভারে ভরপুর ও বর্ণাঢ্য। ‘আদিবাসী সংস্কৃতি’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে বাংলাদেশে বসবাসরত কতিপয় আদিবাসী জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। যার সঙ্গে তাদের ধর্মাচার, জীবনাচার, পালা-পার্বণ ও উৎসবের রয়েছে সম্পূরক সম্পর্ক। তাদের মধ্যে সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুণ্ডা, কোচ, রাজবংশী ও খাসিয়া জনজাতি উল্লেখযোগ্য।
মূলত এরা আদি অস্ট্রিক, মিশ্র এবং মঙ্গেলীয় নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের ধর্ম, ভাষা-সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক, খাদ্যাভাস ও উৎসব-পার্বণ অনেকাংশেই ভিন্নতর। এই গ্রন্থে উল্লিখিত জাতিসত্তাসমূহের ধর্ম ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যই মূলত তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
কবি ও গবেষক মুস্তাফা মজিদ এর রয়েছে ১০টি কাব্যগ্রন্থ। যথাক্রমে- ‘মেঘবতী সুবর্ণভূমি, “তােকে নিয়ে প্রেম প্রেম খেলা, কুসুমিত পঞ্চদশী’, ‘পুষ্পপত্রে নীলকণ্ঠ’, ‘জনযুদ্ধের কনভয়, ‘সাকিন সুবিদখালী’, ‘স্বাতীর কাছে চিঠি’, Diary of a Nepalese Guerrillas সম্পাদিত কবিতাসমগ্র ঃ মাও সেতুঙ এবং নিবেদিত কবিতা সংকলন ‘প্রাণিত রবীন্দ্রনাথ’ । এই কবি কবিতা লেখার পাশাপাশি বাংলাদেশে বসবাসরত। মঙ্গোলীয় ক্ষুদ্র নৃগােষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে লােক প্রশাসন ও আমলাতন্ত্র নিয়েও গবেষণা করে আসছেন। বাংলাদেশের রাখাইন জাতিসত্তার আর্থ-সামাজিক ও প্রশাসনিক সমীক্ষা নিয়ে অভিসন্দর্ভ রচনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেন। যা বাংলাদেশের রাখাইন’ শিরােনামে বাংলা ভাষায় বাংলা। একাডেমী এবং The Rakhaines শিরােনামে ইংরেজি ভাষায়। ঢাকার মাওলা ব্রাদার্স থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় । ড. মুস্তাফা মজিদের এ পর্যন্ত রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ সংখ্যা। ৪০ উর্ধ্ব। তার উল্লেখযােগ্য গ্রন্থের মধ্যে ত্রিপুরা জাতি। পরিচয়’, ‘পটুয়াখালীর রাখাইন উপজাতি', আদিবাসী রাখাইন’, ‘মারমা জাতিসত্তা' বাংলাদেশে মঙ্গোলীয়। আদিবাসী’, ‘গারাে জাতিসত্তহজং জাতিসত্তা’, আদিবাসী সংস্কৃতি (১ম ও ২য় খণ্ড), রূপান্তরের দেশকাল’, ‘সমকালের আত্মকথন’, ‘লােক প্রশাসনের তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ’, ‘বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র', 'রাজনীতিতে সামরিক আমলাতন্ত্র’, ‘নেতৃত্বের স্বরূপ’, বাংলাদেশে বঙ্কিমচন্দ্র’, ‘মুক্ত ও মুগ্ধদৃষ্টির রবীন্দ্র বিতর্ক’ । আর ছােটদের জন্য রচিত ও সম্পাদিত গল্প গ্রন্থ। ‘দীপুর স্বপ্নের অরণি’, ‘জীবন থেকে’ ও ‘ছােটদের ৭টি মঞ্চ নাটক’ এবং জীবনী গ্রন্থ ‘রূপকথার নায়ক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন’ ও ‘বঙ্গবীর ওসমানী। মার্কসীয় মুক্ত চিন্তার যৌক্তিক দৃষ্টবাদে অবিচল মুস্তাফা মজিদ কৈশােরে উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে। অংশগ্রহণসহ কৈশাের থেকেই নানা সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। জড়িত । বাংলা একাডেমীর জীবন সদস্য, জাতীয় কবিতা পরিষদ, ছায়ানট, ঢাকা থিয়েটার ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য। এছাড়াও তিনি সত্তর ও আশির দশকে শিশু-কিশাের। সংগঠন গড়া ও নাট্য আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন । পেশায় প্রথমে সাংবাদিকতা এবং পরে ১৯৮৪ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত আছেন। বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক ড. মুস্তাফা মজিদ ১৯৫৫ সালের ১৪ই এপ্রিল পটুয়াখালী জেলার সুবিদখালীতে জন্মগ্রহণ করেন । ভ্রমণ করেছেন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইডেন, জার্মানী, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ড।