২০১৫ সালের ১৯ নভেম্বর। শীত জেঁকে বসেছে। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। লালমনিরহাট সদরের নর্থ বেঙ্গল গেস্ট হাউজ থেকে ঘুম ঘুম চোখে রওনা দিলাম। যাবো দইখাওয়া স্কুলে। দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। তখনও জানি না গন্তব্যে কী অপার বিস্ময় অপেক্ষা করছে।
সোয়া এক ঘণ্টার পথ। গাড়িতে আমি তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন। ঘুম বলাই শ্রেয়। দইখাওয়া স্কুলের কাছাকাছি যেতেই কানে ভেসে এলো কান্নার রোল। সে এমন কান্না যা কোনো মরা বাড়িতেও শুনিনি কখনও। জোয়ান-বুড়ো-শিশু। কেউ কাঁদছেন নীরবে, কেউ চিৎকার করে। কান্নার আওয়াজে আমি রীতিমতো হতভম্ব। পুরুষের নাকি কাঁদতে হয় না। কিন্তু সেদিন সেই কথিত ব্যকরণেও ছেদ পড়েছিল। ত্রিশোর্ধ্ব যুবক, সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ সবাই কাঁদছেন। আমি নির্বাক তাকিয়ে দেখছি নয়নজলে দেশান্তর।
নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে কাজ শুরু করলাম। ততোক্ষণে সহকর্মী ইরফান হাইয়ুম ক্যামেরা ট্রাইপড নিয়ে নেমে গেছে। ডিএসএনজিতে চন্দনদা রেডি হচ্ছে লাইভের জন্য (ডিএসএনজি হলো¬ ডিজিটাল স্যাটেলাইট নিউজ গ্যাদারিং। একটা পুরোদস্তুর আর্থ স্টেশন। তবে ভ্রাম্যমাণ। একে ওবি বা আউটেডার ব্রডকাস্ট ভ্যানও বলা হয়। যেখান থেকে স্যাটেলাইটে আপলিংক হয়ে সরাসরি টিভিতে প্রচার হয়।)। আমি তখন কাজ করি চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে। সকাল সাতটা থেকে লাইভ শুরু হবে। তার আগে কিছু ছবি নিতে হবে। কান্না-কষ্টের শব্দ-ছবি। এসব না হলে আবার রিপোর্ট জমে না। ইমোশন আসে না। চোখে যাই দেখি না কেন, ক্যামেরায় ধরতে না কোনো পারলে লাভ নেই। রিপোর্ট যুতসই হবে না। আবেগ সামলে পেশাদার হলাম।
ইরফানের ক্যামেরায় ছবি নেওয়া চলছেই। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ল্যান্ডস্কেপে ইরফান খুঁজে চলেছে কথা বলা চোখ। আমি খুঁজছি ভক্সপপ মানে ভয়েস অব পিপল। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কথা। রিপোর্টের জন্য ক্রন্দতরত মলিন মুখগুলোর কথা শুনতে হবে। টিভিতে সম্প্রচারের জন্য কথা বলতে পারবেন এমন মানুষ লাগবে। ক্যামেরায় রেকর্ডের আগে আমি একা কথা বলি। এটা আমার সব সময়ের অভ্যাস। যখন যুতসই কাউকে পাই তখন ক্যামেরা আনি। সবাই আবার অন ক্যামেরা ঠিকঠাক বলতে পারেন না। তাই পারফেক্ট ভক্সপপের জন্য সময় লাগে। কিন্তু সেদিন খুব কষ্ট করতে হয়নি। অনেকের মুখে কথা না থাকলেও, চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতে কথা ছিল সবার।
ঘটা করে কেন এই কান্নার আয়োজন? কেন বিদায় নিতে হবে জন্মভূমি থেকে? এতো সহজ ভিটেবাড়ি ছেড়ে যাওয়া? অনিশ্চিত জেনেও সেই কঠিন কাজটি বেছে নিয়েছিলেন বিলুপ্ত ছিটমহলের প্রায় এক হাজার বাসিন্দা। যে মাটিতে জন্মেছেন, যে গাছের ছায়ায় বেড়ে উঠেছেন সেসব নিমিষেই হয়ে যাবে ‘বিদেশ’। ছিটমহলবাসীদের সবই ছিল। ছিল না শুধু পরিচয়। বাংলাদেশে ছিল ভারতের ১১১টি ছিটমহল। বাসিন্দা ছিল ৩৭ হাজারের মতো। তার মধ্যে প্রথমে ৯৯৮ জন ভারত যেতে চাইলেন। পরে মত বদলান ১৯ জন। শেষ পর্যন্ত ভারত গিয়েছিলেন ৯৭৯ জন। বাকিরা বেছে নিয়েছিলেন জন্মভূমি বাংলাদেশকেই। কিন্তু বেছে নেওয়ার প্রশ্ন কেন এলো তা বুঝতে হলে একটু পেছন ফিরতে হবে। ইতিহাস কপচাতে চাই না। তবু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য একটু বলতেই হয়। ছিটমহলের কান্নার গল্পে আবার ফিরবো।