সাংবাদিকতায় সাক্ষাৎকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা সত্য উন্মোচনের অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচিত। সাক্ষাৎকার কেবল সাংবাদিকতা নয়, এটি এমন এক শিল্প ও নৈপুণ্য, যার সাফল্য নির্ভর করে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর দক্ষতা ও অন্তর্দৃষ্টির ওপর। একজন দক্ষ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তার প্রশ্নের মধ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারেন, যিনি সাক্ষাৎকার দেন জটিল বিষয়গুলোকে তার মুখে তুলে দিতে পারেন, বিশেষ করে যে কথাগুলো তিনি তার পাঠক বা দর্শক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে চান। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যারা মানুষের অভিজ্ঞতার গভীরতা সম্পর্কে জানতে চান, তাদের জন্য সাক্ষাৎকারের শিল্প দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য। সফল একটি সাক্ষাৎকার নির্ভর করে সম্পর্ক স্থাপন করার, আস্থা তৈরি করার এবং খোলামেলা সংলাপের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ক্ষমতার ওপর। সাক্ষাৎকার হলো জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির বিনিময়, যা সাংবাদিকতাকে অমূল্য করে তোলে। এটি এমন একটি হাতিয়ার যা সাংবাদিকদের সরাসরি উৎস থেকে তথ্য, মতামত এবং আবেগ সংগ্রহের সুযোগ করে দেয়; তা একজন প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ বা গ্রহণযোগ্য যেকোনো ব্যক্তি হতে পারেন। প্রশ্ন করা এবং উত্তর দেওয়ার এই প্রত্যক্ষ উপায় একটি বিষয়বস্তুকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়। একটি সুপরিচালিত সাক্ষাৎকার লুকানো সত্য প্রকাশ করতে পারে, অনুমানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে আলোতে আনতে পারে, যা পাঠক ও দর্শক-শ্রোতাদের জন্য আলোকিত ও রূপান্তরকারী হতে পারে।
কারো সাক্ষাৎকার গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তার কর্মক্ষেত্র, অর্জন, সাফল্য-ব্যর্থতা, তাকে ঘিরে বিতর্ক ইত্যাদি সম্পর্কে অবশ্যই পরিপূর্ণ ধারণা অর্জন করতে হবে। এই প্রস্তুতি কেবল যিনি সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারীর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদানই নয়; বরং সাংবাদিক বা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর সচেতনতা এবং মোক্ষম প্রশ্ন করার দক্ষতারও প্রমাণ বহন করবে। সংলাপের শুরুতেই তাকে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে যিনি সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং যে কথাগুলো তিনি বলতে ইচ্ছুক নন, সেগুলোও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করেন। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যে কৌশলই গ্রহণ করা হোক না কেন, তা পেশাদারিত্বের আওতার মধ্যে থাকতে হবে। ডিজিটাল যুগে বা অনলাইন সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রচলিত গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাক্ষাৎকারভিত্তিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মতো নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব সাক্ষাৎকার ও সংলাপের সম্ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সাক্ষাৎকার গ্রহণে সাংবাদিকদের অবশ্যই নৈতিক মান এবং কথা বলার মধ্যে মানবিক উপাদান বজায় রাখতে হবে। কারণ প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যেও মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্ম নির্বিশেষে সাক্ষাৎকারের মৌলিক বিষয়গুলো অপরিবর্তিত রয়েছে।
সাংবাদিকতা জীবনে আমাকে মুগ্ধ করেছে বেশ ক’জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার গ্রহণের শৈল্পিক ধরন। তাদের কেউ কেউ বিশ্ব ব্যক্তিত্বদের আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করে দুনিয়া কাঁপিয়েছেন, কেউ কেউ ধৈর্যের সঙ্গে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সত্য বের করে এনেছেন। এসব সাংবাদিকের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন ইতালির ওরিয়ানা ফালাচি, ব্রিটিশ সাংবাদিক স্যার ডেভিড ফ্রস্ট, আমেরিকান সাংবাদিক ড্যান র্যাদার, পিটার আর্নেট। ওরিয়ানা ফালাচি ষাট ও সত্তরের দশকে বহু রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং বরেণ্য ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। আমি তার নেওয়া সাক্ষাকারগুলোর মধ্যে ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাক্ষাৎকার প্রথম পাঠ করি। এরপর তার নেওয়া আরো অনেকগুলো সাক্ষাৎকার পড়ার সুযোগ হয়। তার নেওয়া বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি’ পাঠ করার পর সেটি বাংলায় অনুবাদ করি। ১৯৮৬ সালে এটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাভাষী পাঠকরা সাদরে গ্রহণ করেন। এখনো বইটি বহুল পঠিত বইয়ের মধ্যে গণ্য।
‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি’ বাংলায় প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ত্রিশ বছর পর আমি বেশ ক’জন সাংবাদিকের নেওয়া আন্তর্জাতিক কয়েক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে তুলে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করি, যাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান, পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, পাকিস্তানের তিন সামরিক নেতা জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেন, মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী, নোবেল বিজয়ী মিশরীয় কথাসাহিত্যিক নাগিব মাহফুজ, আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নেতা ম্যালকম এক্স, ওরিয়ানা ফালাচি এবং ভারতের খ্যাতিমান সাংবাদিক-সাহিত্যিক খুশবন্ত সিং। তাদের কেউ জীবিত নেই। কিন্তু তারা যা বলে গেছেন তা কালোত্তীর্ণ এবং সময়ের ব্যবধানেও শিক্ষণীয়। আশা করি পাঠকরা এই সাক্ষাৎকারগুলো সাদরে গ্রহণ করবেন।