হুমায়ুন কবিরের গুম এবং অতঃপর বইকে আমি কেবল বই বলি না, বলি একটা দলিল। বলি এক প্রামাণ্যচিত্র।
এই বইটা আমাদের মনে করিয়ে দিবে আমরা কীসের মাঝে ছিলাম? কীভাবে আমাদের দেশের যেকোনো সাধারণ মানুষ, কোনো বিরোধী মতাদর্শের মানুষের উপর রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিপীড়ন চালানো হয়েছিল প্রায় ১৬ বছর ধরে। কীভাবে মৌলিক মানবাধিকার হরণ করা হয়েছিল। কীভাবে নিরপরাধ ব্যক্তির কল্পিত মিথ্যা পাপের সাজা সেই ব্যক্তিকে তো বটেই, তাঁর পরিবারকেও ভোগ করতে হয়েছিল। আইনের দোহাই দিয়ে একজন মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক, পেশাগতসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রকে অসহনীয় করে তোলা হয়েছিল।
পৃথিবীর মহান শাসক, রাজনীতিবিদ, সমরনায়করা সমাজের প্রচলিত অনার কোড মেনে চলেছেন, সহজাত সৌজন্যবোধ যাদের মাঝে উপস্থিত ছিল, তারা পরাজিত শত্রুকে পর্যন্ত যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে। অথচ নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি যে ঘৃণ্য, অমানবিক নির্যাতন এক যুগের বেশি সময় ধরে এ দেশে চলেছে, রাজনৈতিক মতাদর্শে একজন ভিন্নমতাবলম্বীকে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে একেবারেই নন এনটিটি বানানোর যে প্রক্রিয়া, অস্তিত্বহীন জড় বস্তুসুলভ যে দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন জারি ছিল, সেটা মানব ইতিহাসে বিরল।
আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের এইসব অপকর্মের জবাব বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা দিয়েছে। যে ঘৃণায় মানুষ আওয়ামী লীগকে স্মরণ করে এবং ভবিষ্যতেও করবে সেটা তুলনারহিত। কিন্তু যেহেতু মানুষের স্মৃতির মেয়াদ অসীম নয়, ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সময়ের ডকুমেন্টেশন রেখে যাওয়া জরুরি। এটা আমাদের দায়। প্রজন্মের দায়। হুমায়ুন কবির সেই কাজটা নিষ্ঠা ও সততার সাথে করে আমাদেরকে কিছুটা হলেও দায়মুক্ত করলেন।
দেশ ও জাতি গঠনের অনেক বড় কাজ আমাদের সামনে। সাথে এটাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। ইনসাফের এক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা। সেই ভবিষ্যতের দিকে এই বই আমাদেরকে এক জরুরি লেন্স দিয়ে অতীতকে দেখতে সাহায্য করবে।