বাংলাদেশের যেকোনো গবেষণা, বিশ্লেষণ ও অধ্যয়ন বস্তুনিষ্ঠ হওয়া সত্যিই কঠিন। এখানে দলতন্ত্র, সুবিধাতন্ত্র এবং তোষামোদ-চাটুকারিতা এতটাই নিম্নমানে পৌঁছেছে যে, তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের ওপর মানুষ ত্যক্ত ও বিরক্ত। যাত্রাগানের বন্দনার মতো বিগত দশকগুলোতে বাংলাদেশের যেকোনো আলোচনার সূত্রপাতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনিবার্য। আর তা শেষ হতো হাসিনা বন্দনার মাধ্যমে। স্বেচ্ছাচারের লৌহশাসন (Iron Law of Oligarchy) অতিক্রম করে ২০২৪ সালের সূর্যসারথীরা নতুন বয়ান, নতুন ইতিহাস ও নতুন অভিধা নির্মাণ করেছে। সমাজবিজ্ঞানের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া (Socialization Process) সম্পর্কে যারা অভিহিত তারা অবাক বিস্ময়ে দেখলেন তথাকথিত হাজার বছরের ইতিহাস এক নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল। শুধুমাত্র শেখ হাসিনা আভাসই চ‚র্ণ-বিচ‚র্ণ হয়নি, মানুষ সমূলে উৎপাটন করেছে ‘মসজিদের শহরে ভাস্কর্যের নামে স্থাপিত মূর্তিগুলো। কী বিস্ময়ের ব্যাপার! ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পরও মূর্তিবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। আজকের জিরো পয়েন্টে একটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল। মানুষ বিশ্বাস করে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে সৈনিকরা তা অপসারণ করে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অমর একুশে নিয়েও বিতর্ক ওঠে। অবশেষে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে অমর একুশে স্থায়িত্ব অর্জন করে। সে যা-ই হোক উপস্থাপিত গ্রন্থে সেই অতীত এবং বর্তমানের সাথে সেতুবন্ধনের একটি প্রয়াস বিধৃত হয়েছে।
এই ইতিহাস ও অধ্যয়নের মধ্যমণি জিয়াউর রহমান। তিনি এ জাতির ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন সংকটের নেতা (Leader of the Crisis) হিসেবে। তিনি যেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে একটি ক্রান্তিকালীন সময়ে জাতিকে নির্দেশনা দেন, তেমনি ১৯৭৫ সালের সিপাহি জনতার বিপ্লবে তিনিই অবশেষে ত্রাণকর্তা হিসেবে আভির্ভূত হন। সেই সময়ের প্রাণবন্ত ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের শাসনকাল সম্পর্কে অভিসন্দর্ভ রচনা করতে গিয়ে অনেক অজানা তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি। সেগুলো নিয়ে এর আগেও ১৯৯৯ সালে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এবার নতুন করে নতুন অবয়বে গ্রন্থটি প্রকাশ করা হলো। এতে নতুন কিছু লেখার সংযোজন রয়েছে। বিশেষত ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের চেতনা পরম্পরা প্রদর্শনের প্রয়াস রয়েছে। সেদিন মুখ্য ঘটনার অনুঘটক ছিল সেনাবাহিনীর সিপাহিরা। আর আজকের গণবিপ্লবের অনুঘটক হিসেবে বিপ্লবের সূত্রপাত করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
যেকোনো গ্রন্থ প্রকাশনা একক প্রচেষ্টার ফল নয়। এখানে সন্নিবেশিত প্রবন্ধ দু’রকমের- প্রথমত সম্পাদিত পিএইচডি সন্ধর্ভের কিছুটা অনুরণন রয়েছে; দ্বিতীয়ত পরবর্তীকালে সময়ের সমীক্ষায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে ৭ নভেম্বর সম্পর্কিত কলামগুলো এখানে স্থান পেয়েছে। সুতরাং এই দুটো পর্যায়ই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে।
সমাজ ও রাজনীতি অধ্যয়ন একটি পরিচিত নাম। বিগত চার দশক ধরে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তিনি অধ্যয়ন, গবেষণা ও পাঠদান করছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রফেসর। ইতিপূর্বে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, সমকালীন রাজনীতির ভাষা, জাতীয় ঐকমত্য ও উন্নয়ন সংকট, অসমাপ্ত রাজনৈতিক সংস্কার, বাংলাদেশ সমাজ ও রাজনীতি এবং পাশ্চাত্য রাষ্ট্রদর্শন। তাঁর গবেষণালব্ধ অভিসন্দর্ভ : A Political Study of Zia Regime| লেখকের সম্পাদিত গ্রন্থ : সার্বিক উন্নয়ন সমীক্ষা এবং সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তা। গ্রন্থকারের আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে Good Governance, Security Studies এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি। তাঁর প্রকাশিতব্য সম্পাদনা : একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্রচিন্তা। Changing Pattern of Civil-Military Relation in Bangladesh- তাঁর চলমান গবেষণা কর্ম।