ইয়াহইয়া সিনওয়ারের আশ-শাওক ওয়াল- কারানফুল-এর তরজমা কাঁটা ও কারানফুল। খুবই বিচিত্র ধরনের বই এটি। নিঃশেষে সাহিত্যের কোনো শ্রেণিতে ফেলা যায় না। উপন্যাস, ইতিহাস, নাকি আত্মজীবনী? হয়তো হুবহু কোনোটিই নয়, অথবা তিনটিই। ঘটনার প্রবাহ ও আঙ্গিক উপন্যাসের; কিন্তু তা উপন্যাসের মতো কল্পনাশ্রয়ী নয়, বরং ইতিহাসের মতো সত্যাশ্রয়ী; সর্বোপরি সেই ঘটনাপ্রবাহ বিবৃত হয় লেখকের জবানিতে, তাঁরই আদ্যন্ত আত্মজীবন ঘিরে। এভাবেই একটি মিশ্রিত ও ত্রিমাত্রিক চেহারা পেয়েছে বইটি।
বইটি প্রকাশের পরপরই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। এর কারণ সম্ভবত, যদি উপন্যাস বলি, তবে তার লেখক কোনো শৌখিন ঔপন্যাসিক নন। যুদ্ধের ময়দানের রক্তস্রোত ও অগ্নিঝড়ে আজীবন নেতৃত্ব দিয়ে চলা এক দুঃসাহসী সেনাপতি তিনি। ইসরাইলের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘খান ইউনিসের জল্লাদ’ নামে। ইয়াহুদি শত্রুদের নিশ্ছিদ্র কারাগারে বন্দি ছিলেন টানা ২৩ বছর। ইশেল কারাগারের কঠিন প্রহরা ফাঁকি দিয়ে কীভাবে তিনি এত বড় বই লিখলেন এবং তা বাইরে পাঠালেন, সে এক নিরুত্তর বিস্ময়।
গল্প বলতে শুরু করে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার খান ইউনিস শরণার্থী শিবিরের উদ্বাস্তু পরিবারের পাঁচ বছরের এক শিশু, যখন সে যুদ্ধের তাণ্ডব থেকে বাঁচতে তার পরিবারের সঙ্গে ঠাঁই নেয় ভূগর্ভের অন্ধকার গর্তে। পাতার পর পাতা জুড়ে সে এঁকে চলে তার কঠিন জীবনযুদ্ধের ছবি। নির্বাসন, দারিদ্র্য, কারফিউ, আতঙ্ক, পড়ালেখা, নিপীড়ন, নৃশংসতা, শোক, উচ্ছেদ, ধ্বংসস্তূপ, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিরোধ, যুদ্ধ ও আত্মত্যাগের এক শ্বাসরুদ্ধকর আখ্যান এ বই। সে আখ্যান এমনই জীবন্ত, পড়তে পড়তে মনে হবে আপনি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন মাথা-নত-না করা এক অকুতোভয় জনগোষ্ঠীর আজাদির লড়াই। থেকে থেকে সচকিত হবেন শহিদ ইয়াহইয়া সিনওয়ারের প্রত্যয়ী অভিজ্ঞান ও তাঁর অন্তর্দৃষ্টির আলোকচ্ছটায়।
ইয়াহইয়া সিনওয়ার। ফিলিস্তিনের একজন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, যোদ্ধা, লেখক, গবেষক। ফিলিস্তিনের সামরিক ও রাজনৈতিক দল হামাস-এর রাজনৈতিক শাখার প্রধান। ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ফিলিস্তিনের দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি বাহিনির সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে ইয়াহইয়া সিনওয়ার শহিদ হন। ধারণা করা হয়, গত বছর ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলার পরিকল্পনাটি ছিল তার। ১৯৬২ সালে খান ইউনিসের শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া সিনওয়ারের যৌবন কেটেছে ইসরায়েলি কারাগারে। খান ইউনিস সেকেন্ডারি স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যারাবিক স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ২০১১ সালে মুক্তির পর তিনি গাজায় হামাসের প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তেইশ বছরের বন্দি জীবনে তিনি চমৎকার হিব্রু শেখেন। হিব্রু থেকে গোয়েন্দা সংস্থা শিন-বেতের দুই প্রধানের তিনটি বই অনুবাদ করেন। এ ছাড়াও লেখেন আরও দুইটি গবেষণা গ্রন্থ, একটি আখ্যান ও একটি উপন্যাস—‘আশ-শাওক ওয়াল কারানফুল’ (কাঁটা ও ফুল)। পুরো নাম ইয়াহিয়া ইবরাহিম হাসান সিনওয়ার। ১৯৮৫ সালে তিনি রাহি মুশতাহার সাথে নিরাপত্তাসংস্থা ‘মাজদ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯৮৭ সালে হামাসের ‘পুলিশ’ প্রশাসনে রূপান্তরি হয়। ২০১৭ সালে গাজার প্রশাসনিক কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৮ তিনি গাজাবাসীকে ইসরায়েলি অবরোধ ভেঙে ফেলতে উৎসাহিত করে বলেন, ‘আমরা নিপীড়ন ও অপমানে মারা যাবার চেয়ে শহিদ হয়ে মরতে চাই।’ সিনওয়ার ছিলেন গাজায় সর্বোচ্চ পদমর্যাদার হামাস কর্মকর্তা। ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই ইসমাইল হানিয়া ইরানে শহিদ হলে সিনওয়ার হন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ৩ সন্তানের জনক। তার স্ত্রী সালিহা সামার ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ৩ ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাকি ২ ভাইয়ের একজন মোহাম্মদ সিনওয়ার হামাসের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং অন্যজন যাকারিয়া সিনওয়ার ফিলিস্তিনের খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ও একাডেমিশিয়ান।