বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমানের আদি বাড়ি বগুড়া জেলার গাবতলী থানার মহিষাভান গ্রামে। তবে তার দাদীর বাড়ি, এই থানার বাগবাড়ি গ্রামের তালুকদার বাড়িতে বেশি সময় থাকতেন। এই বাড়িতেই তিনি জন্ম গ্রহন করেন। জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল কমল। নামের মতই তিনি ছিলেন কোমল, সজীব, সতেজ ও লজ্জাশীল। তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব শান্ত প্রকৃতির ছিলেন। তিনি কখনোই তার বন্ধুদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ বা মারামারি করতেন না, সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। তাই সবাই উনাকে আদর করতেন পরম মমতায়। ছোট বেলায় তিনি মাঝে মাঝে চুপচাপ বসে থাকতেন। তিনি একা কী যেন ভাবতেন। সব কিছুতেই উনার কৌতূহল ছিল। উনি সামনে যা পেতেন খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতেন। ছোটবেলা থেকেই জিয়াউর রহমান বই পড়তে ভালোবাসতেন। তিনি ইংরেজিতে খুব ভালো বক্তৃতা করতেন ও নিয়মিত বিদ্যালয়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। একবার তিনি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। তিনি রোজ ব্যায়াম করতেন ও নিয়মিত খেলাধূলা করতেন। উনার প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল ও হকি। তিনি জানতেন খেলাধূলা করলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মন-ভালো থাকে, পড়াশোনা ভালো হয়। তিনি খুব ভালো দৌঁড়াতে পারতেন। দৌঁড় প্রতিযোগিতায় তিনি কয়েকবার পুরস্কার পান।
জিয়াউর রহমানের পিতার নাম মনসুর রহমান। উনার স্থায়ী নিবাস ছিল বগুড়া জেলার বাগবাড়ি গ্রামে। তিনি ছিলেন একজন রসায়নবিদ। তিনি ১৯৪৭ সালের পূর্বে চাকরির জন্য কলকাতায় বসবাস করতেন। পাকিস্তান হওয়ার পরে তিনি করাচি যান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। তিনি ১৯৭০ সালে ইন্তেকাল করেন।
জিয়াউর রহমানের মাতার নাম জাহানারা খাতুন ওরফে রানী। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিনী এবং অনেক গুণে গুণান্বিতা। তিনি খুব মিশুক ছিলেন। তাই সবার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। তিনি ছিলেন সুললিত কন্ঠের অধিকারিণী। করাচি বেতারে তিনি নিয়মিত নজরুল সঙ্গীত ও গজল পরিবেশন করতেন। সে সময়ে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
জিয়াউর রহমানের দাদা ছিলেন মৌলভী কামাল উদ্দিন। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশীয়, ধর্মপাণ, সৎ, নিষ্ঠাবাণ ও দীর্ঘদেহী সুপুরুষ। অঢেল ধন সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব সাদা-মাটা জীবন যাপন করতেন। আরাম আয়েশ তেমন পছন্দ করতেন না। পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন বেশি। তার একটি সুন্দর গুণ ছিল, তিনি পুত্র-কন্যাদের সব সময় পূর্ণনাম ধরে ডাকতেন।
জিয়াউর রহমানের দাদির নাম ছিল মিসিরুন্নেসা। তিনি অভিজাত ও ধনাঢ্য পরিবারের কন্যা ছিলেন। ছিলেন আদর্শ, মহীয়সী নারী সেই সাথে শিক্ষিতা, ধর্মপ্রাণ ও অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী।
জিয়াউর রহমানের নানার নাম ছিল আবুল কাশেম। তিনি জলপাইগুড়ি বাসবাস করতেন। পারিবারিকভাবে তাদের চায়ের ব্যবসা ছিল। ধনে, গুণে, মানে ছিলেন অনুসরণীয় মানুষ। অত্যন্ত বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও কোন অহংকার ছিল না। পরের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন অকাতরে; অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতেন, অন্যের ব্যথায় হতেন ব্যথিত। এজন্য সবাই তাকে ভালোবাসত আপনজনের মত।
জিয়াউর রহমানের নানীর নাম রহিমা খাতুন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্ভ্রান্তবংশীয়।
জিয়াউর রহমানরা পাঁচ ভাই। তাদের কোন বোন ছিল না। সব ভাই উচ্চ শিক্ষিত এবং স্ব স্ব পেশায় প্রতিষ্ঠিত।
জিয়াউর রহমানের বড় ভাইয়ের নাম ছিল রেজাউর রহমান। তিনি পেশায় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। তৃতীয় ভাইয়ের নাম ছিল মিজানুর রহমান। তিনি বি.সি.আই এর লন্ডন শাখায় চাকরি করতেন। চতুর্থ ভাইয়ের নাম ছিল খলিলুর রহমান। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট ফার্মাসিস্ট, চাকরি করতেন যুক্তরাষ্টে। ছোট ভাইয়ের নাম আহমেদ কামাল। তিনি পর্যটন কর্পোরেশনে চাকরি করতেন।
জিয়াউর রহমানের চাচার নাম ছিল মমতাজুর রহমান। তিনি ছিলেন মিলিটারি অফিসার। জিয়াউর রহমান চাচা-চাচীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। চাচাকে অনুসরণ করেই তিনি সামরিক বাহিনিতে যোগদান করেন।
জিয়াউর রহমানের শিক্ষা জীবন
জিয়াউর রহমান কলকাতায় লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি ১৯৪২ সালে প্রথমে “শিশু বিদ্যাপিঠ” নামের একটি স্কুলে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঢেউ এসে লাগে ভারতবর্ষে। জাপান, কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বোমা বর্ষণ শুরু করলে শহরের মানুষ গ্রামে ছুটে যায়। উনার পিতা মনসুর রহমানও পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে আসেন বগুড়ার বাগবাড়িতে। তিনি বাগবাড়ি স্কুলে ক্লাস টু-তে ভর্তি হন। এখানে তিনি এক বছর ছিলেন। ১৯৪৩ সালে জিয়াউর রহমান আবার কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি কলকাতার ঐতিহাসিক ‘হেয়ার স্কুলে’ ভর্তি হন। খ্রিষ্টান মিশনারি দ্বারা পরিচালিত এ স্কুলটি ছিল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা পতিষ্ঠান।
ভারত বিভক্তির পর জিয়াউর রহমানের বাবা বদলি হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি চলে যান। সেখানে ১৯৪৮ সালে জিয়াউর রহমান ভর্তি হন করাচি একাডেমি স্কুলে। এ স্কুলটির বর্তমান নাম তায়েব আলী আলভী একাডেমি। জিয়াউর রহমান এই স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেন। তারপর ভর্তি হন করাচি ডি জে কলেজে। যেহেতু তিনি চাচার সাথে বেশি সময় কাটাতেন সেহেতু চাচার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় এবং তার ব্যক্তিগত জীবনের শৃঙ্খলা দেখে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় সেনাবাহিনীর সার্কুলার হলে তিনি সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তিনি হতে চেয়েছিলেন একজন আদর্শবান ডাক্তার। এ স্বপ্নই লালন করতেন সৈনিক হবার আগ পর্যন্ত। গরিব-দুঃখী মানুষের চিকিৎসা করার আকাঙ্খা ছিল তার দূর্বার।
সৈনিক জীবন
জিয়াউর রহমান ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে একজন ক্যাডেট অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পেরে তিনি খুব খুশি হলেন। সেনাবাহিনীর ট্রেনিং নেওয়ার জন্য তিনি প্রথম কোয়েটা গেলেন। পরে গেলেন কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে। তার সামরিক বাহিনী জীবন অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। তার কর্তব্যপরায়ণতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও সততা সম্পর্কে বহু জনশ্রুতি আছে। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ সৈনিকের মূর্ত প্রতীক ও দেশপ্রেমিকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উনার এসব বিরল গুণের পরিচয় পাওয়া যায় বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলায় তার বিচক্ষণতা, অদম্য সাহস ও অপূর্ব বুদ্ধিমত্তায়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে থাকাকালীন সময় একদিন কয়েকজন পাকিস্তানী ক্যাডেট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্যাডেট ও বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় নেতা ও বীরদের বিরূপ সমালোচনা করল। এ নিয়ে জিয়াউর রহমানের সাথে তাদের প্রচন্ড তর্ক-বিতর্ক চলে। থামছেই না। পরে সিদ্ধান্ত হলো মুষ্টিযুদ্ধ করে যে জিতবে তার কথাই সত্যি হবে। জাতীয় বীরদের সম্মানে জিয়াউর রহমান সেদিন বক্সিং গ্লাভস পড়লেন। পশ্চিম পাকিস্তানীদের পক্ষে গ্লাভস পড়ল লতিফ নামে একজন ক্যাডেট। কিন্তু জিয়াউর রহমান তাকে আধ মিনিটেই ধরাশয়ী করলেন। জিয়াউর রহমান যখন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ট্রেনিং নেন, বয়সে তরুণ হলেও তিনি ছিলেন শান্ত ও চুপচাপ। কিন্তু আত্মমর্যাদা ও তেজস্বীতে ছিলেন ভরপুর। সে সময়ের একটি ঘটনা। একাডেমির ফুটবল মাঠে খেলা শেষে জিয়াউর রহমান, এম এ হামিদ এবং কয়েকজন পাঞ্জাবী বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কথায় কথায় একজন পাঞ্জাবী জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন। এবার জিয়াউর রহমানের ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি অন্যদিকে তাকাতে তাকাতে উঠে দাঁড়ালেন। অকস্মাৎ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুষির পর ঘুষি মারতে লাগলেন। অন্য এক পাঞ্জাবী ছুটে আসলে এমএ হামিদও যোগ দিল। সবশেষ মারামরি থামাতে সিনিয়র ক্যাডেট এসে নাম ও নম্বর লিখে নিলেন। এরপর থেকে কেউ জিয়াউর রহমানকে অশোভন মন্তব্য করে নাই। জিয়াউর রহমান ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন লাভ করেন। এরপর তিনি কমান্ডো ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ক্ষিপ্রতার সাথে শত্রু মোকাবিলা করার ব্যাপারে তিনি কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি সফল শৌর্য বীর্যের পরিচয় দেন। প্যারাট্রুপার হিসাবেও তিনি দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেন। উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য তিনি বিদেশ গমন করেন। প্রকৃত সৈনিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম অব্যাহত রাখেন।
বিয়ে
জিয়াউর রহমান ১৯৬০ সালে খালেদা ইস্কেন্দার (পুতুল) কে বিয়ে করেন। বিয়ের পর খালেদা ইস্কেন্দার হলেন বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়াই পরে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ফেনী ফুলগাজি বাজারের নিকটবর্তী শ্রীপুর গ্রামের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, সম্মানী ও শিক্ষিত মুসলিম পরিবারের সন্তান। তাঁরা ছিলেন বিখ্যাত তালুকদার ফুলগাজি মজুমদারের বংশধর। শিক্ষা-দীক্ষা আর ধনদৌলতে তখন তারা ছিল অনন্য। বাড়িতে বড় পুকুর ছিল। মসজিদ ছিল। ইস্কান্দার আলীর বড় ভাই ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি উকিল সাদেক নামে সমগ্র অঞ্চলে সুপরিচিত ছিলেন। সিকান্দার আলী মজুমদার জলপাইগুড়ি টি-এস্টেট চাকরি করতেন। নবাব মোশারফ হোসেনের জলপাইগুড়ি টি এস্টেটের সেক্রেটারী ছিলেন তিনি। চাকরির সুবাদে পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি জলপাইগুড়ি থাকতেন।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়ির একটি সুন্দর বাংলো প্যাটার্ন বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার খুব আদরে ছিলেন তিনি। তাই বাবা তাকে পুতুল বলে ডাকতেন। এছাড়া তিনি ছিলেন পুতুলের মতোই ফুটফুটে ও সুন্দর। তাই ধীরে ধীরে তার নামও পুতুল হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান জলপাইগুড়িতে ছিলেন কিছুদিন। তিনি ছিলেন টি ফ্যামিলির সদস্য। তার সঙ্গে সেখানেই পুতুলের পিতা ইস্কান্দার আলী মজুমদারের পরিচয় হয়। সে পরিচয় দিন দিন গভীর হয়ে উঠে। এমনিভাবে এই দুই পরিবারের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে মনসুর রহমান সপরিবারে চলে গেলেন করাচী। আর সেখানেই শুরু করলেন নতুন জীবন। ইস্কান্দার আলী মজুমদার জলপাইগুড়ি ছেড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন দিনাজপুর। এমনিভাবে দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্ব বাড়লো অনেক। কিন্তু আন্তরিকতা কমেনি। পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল দুই পরিবারের মধ্যে। তারপর যথাসময়ে জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন খালেদা ইস্কান্দার। এরপর ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্্ন নিয়ে জিয়াউর রহমান শুরু করেন বৈবাহিক জীবন।