কফির সুগন্ধে খুঁজে পাওয়া জীবনের গল্প
Before the Coffee Gets Cold সিরিজটি সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং মনোগত। গল্পের প্রতিটি পরতে, প্রতিটি চরিত্রে আমি নিজের জীবনের একটি অংশ খুঁজে পেয়েছি। সিরিজটি কেবল কয়েকটি বই নয়; এটি সময়, সম্পর্ক এবং জীবনের অনির্বচনীয় অনুভূতিগুলোর প্রতি এক মনোমুগ্ধকর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
Before the Coffee Gets Cold সিরিজটি পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত এবং প্রতিটি খণ্ডের নাম একটি নির্দিষ্ট গল্পের থিম বা আবেগকে প্রতিফলিত করে রচিত। প্রতিটি খণ্ডে গল্পগুলো আলাদা, কিন্তু একই সময় ও স্থানকে কেন্দ্র করে সেগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। বইয়ের নামগুলো গল্পের মূল বার্তার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। গল্পগুলো শেখায় জীবনের প্রতিটি পর্যায়, প্রতিটি আবেগ এবং প্রতিটি স্মৃতি কীভাবে সময়ের মায়াজালে আবদ্ধ।
বইটির সম্পাদনার সময় আমি বহুবার সময়ের আবর্তে হারিয়ে গিয়েছি। এক কাপ কফির ধোঁয়া আর গল্পের পৃষ্ঠাগুলো যেন আমাকে বারবার জীবন ও সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। কখনো অতীতের ভুল, কখনো অনুশোচনা, কখনো বা কোনো অসমাপ্ত কথার ভার, বর্তমানকে ইচ্ছের ছাঁচে বন্দি করতে চাওয়া, কিংবা ভবিষ্যতের নাগাল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা -প্রতিটি অনুভূতিই যেন আমায় নতুন করে বুঝিয়েছে মানবজীবনে প্রতিটি মুহূর্তের গুরুত্ব ও সম্পর্কের গভীরতা।
বইটির সবচেয়ে অনন্য দিক হলো সময় ভ্রমণের প্রতীকী উপস্থাপনা। যদিও সময় ভ্রমণের বিষয়বস্তুটি এখনও পর্যন্ত কল্প-কথা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, তবুও এটি আমাদের জীবনের অতীত মুহূর্তগুলো পুনরুদ্ধারের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার কথা বলে, বলে অজানা ভবিষ্যতকে হাতের মুঠোয় পুরতে চাওয়ার বাসনার কথা। মানুষের জীবনে এমন কত মূহূর্ত আছে, যেগুলো পুনরায় ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে থাকে। সম্পাদনার সময় উপলব্ধি করেছি, এই মুহূর্তগুলো ফিরে পাওয়া সম্ভব না হলেও সঠিক সময়ে সঠিকভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারলে জীবনে অনুশোচনা কম হয়, মনস্তাপে ভুগতে হয় না। সঠিক আবেগ প্রকাশ করার জন্য যে-কোনো সময়ই সঠিক সময় হতে পারে, এক্ষেত্রে দেরি হয়ে গেছে ভেবে অনুভূতি চেপে যাওয়া অনুচিত।
Before the Coffee Gets Cold সিরিজের ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের সম্পাদনা করতে গিয়ে অনুবাদের মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু দিক বিবেচনা করা হয়েছে। মূল লেখক তোশিকাযু কাওয়াগুচির লেখায় যে আবেগপ্রবণতা, মানবিকতা ও সম্পর্কের জটিলতা রয়েছে, সেগুলো বাংলা অনুবাদে যথাযথভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। মূল গল্পের হৃদয়গ্রাহী দিকগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, অনুবাদক সেদিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছেন, সম্পাদনার ক্ষেত্রেও সেই দিকগুলো গুরুত্বসহ বিবেচনা করা হয়েছে। সহজবোধ্য, প্রাঞ্জল ও পাঠকদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্যগঠন এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে মূল গল্পের গতি ও স্বর বজায় থাকে এবং বাংলা ভাষায় পড়তে কৃত্রিম মনে না হয়। তোশিকাযু কাওয়াগুচির গল্প বলার সরলতা ও সংবেদনশীল শৈলী অনুবাদেও যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাঠকেরা সহজেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন এবং গল্পের গভীরতা অনুধাবন করতে পারবেন।
সম্পাদনার প্রতিটি ধাপে আমি চরিত্রগুলোর অনুভূতিগুলোর সাথে একাত্ম হয়েছি। তাদের যন্ত্রণায় কেঁদেছি, তাদের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছি। এই প্রক্রিয়া আমাকে বইটির গল্পের চেয়ে বেশি তার অনুভূতিগুলোর প্রতি নিবেদিত করেছে। কফির কাপ হাতে নিয়ে প্রতিবার যখন গল্পের গভীরে গিয়েছি, মনে হয়েছে যেন আমি নিজেই সেই ক্যাফেতে বসে আছি, গল্পের চরিত্রদের সাথে।
Before the Coffee Gets Cold সিরিজের বইগুলো আমাদের শেখায়, সময় থেমে থাকে না। অতীতের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ হয়তো আমাদের হাতে নেই, কিন্তু বর্তমানকে ভালোবাসার জন্য সময় এখনও রয়েছে। এই গল্পগুলো শুধু পড়ে শেষ করার নয়; এগুলো অনুভবের, জীবনের।
আমি বিশ্বাস করি, এই সিরিজটি আপনাদের জীবনের গল্পের সাথে একাত্ম হবে। প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সংলাপ আপনাদের জীবনের এমন কিছু মূহূর্ত স্মরণ করিয়ে দেবে, যা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন। এই বইগুলো আপনাকে ভাবাবে, আপনার সম্পর্কগুলোর দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করবে এবং বর্তমানকে আরও বেশি উপভোগ করার জন্য অনুপ্রাণিত করবে।