ভূমিকা
মানব সভ্যতার বিকাশে চরিত্র গঠন একটি মৌলিক উপাদান। আরবি, ইংরেজিসহ পৃথিবীর বহু ভাষা প্রচলিত এবং প্রতিটি ভাষার একটি নিজস্ব গতি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আমরা বাংলা ভাষাভাষীগণ চরিত্র গঠনে যথেষ্ঠ উৎসাহী, কিন্তু হতবাক হলেও বিষয়টি সত্য যে, বাংলা ভাষার মাধ্যমে মানুষের চরিত্র গঠনের কোনো উপাদান বা গঠনমূলক বই আমাদের মাঝে তেমন বিদ্যমান নেই। আমার বাংলা ভাষার দক্ষতা সীমিত। তবুও মনে হলো কিছু একটা করা দরকার। তাই প্রথম কলমধারণ করেছি এবং জীবনঘনিষ্ঠ কিছু গল্প পাঠককে উপহার দিয়েছি। পাঠকসমাজে এসব ক্ষুদ্র গল্প সমাদৃত হলে আমার প্রচেষ্টা স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি। পাঠকের নজরে কোনো ভুলত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে পরবর্তীতে সংশোধনের প্রয়াস চালাব ইনশাআল্লাহ।
আমার সহধর্মিণী নাছিমা আরা আহমাদ, ছেলে এম. বিল্লাহ বিন আহমাদ কন্যাদ্বয় সুমাইয়া বিনতে আহমাদ, উম্মেহানি বিনতে আহমাদ এবং একমাত্র পুত্রবধু তাসনীম তাবাসসুম গ্রন্থটি প্রণয়নে উৎসাহ প্রদান করায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। গ্রন্থটি পাঠক সমাজের উপকারে আসলে আমার শ্রম সার্থক হবে বলে আমার বিশ্বাস। মহান আল্লাহ আমার শ্রম কবুল করুন। আমিন।
লেখক
আশিকের সফলতা
আশিক দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। নিজ গ্রাম একটু দূরে হওয়ায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে কলেজে পড়তে আসা-যাওয়া করতে একটু অসুবিধে বৈকি? কিন্তু বিষয়টি অভিভাবকরা বুঝতে পেরেও কাছে থাকার ব্যবস্থা করার সামর্থ তাদের নেই। বাবা অবসর প্রাপ্ত, তাই তার পক্ষে ব্যয়ভার বহন করাও সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় আশিক বিপাকে পড়ে। হঠাৎ একদিন কলেজ কর্তৃপক্ষের নোটিশ পেলÑ এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় যারা ভালো নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের মাঝে প্রতিযোগীতা হবে। প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদেরকে স্কলারশিপ দেওয়া হবে, সাথে থাকবে হোস্টেল ফ্রি। দ্বাদশ শ্রেণির ছেলেরা সাধ্যমতো প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর আশিকও পিছিয়ে নেই। পরীক্ষার সপ্তাহখানেক পূর্বে ইংরেজি পড়াতে এসে ইংরেজি বিষয়ক সহকারী অধ্যাপক তাহের স্যার প্রশ্ন করলেন, তোমরা স্কলারশিপের জন্য পরীক্ষা দিচ্ছ কতজন? প্রায় বিশ হতে ত্রিশজন হাত তুলল। সংখ্যা বেশি দেখে আশিক কিছুটা ভীত হলো। এতক্ষণে তাহের স্যার বিষয়টি জানালেন। তোমরা কি জানতে পেরেছ এটা কিসের স্কলারশিপ? ছেলেরা উত্তরে না বলায় তিনি বললেন, এটি নবাব ফয়জুন্নেছা কর্তৃক ঘোষিত স্কলারশিপ। এটা পাকিস্তান পিরিয়ডে একসময় বারো-চৌদ্দজনকে দেওয়া হতো, আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন পাবে মাত্র একজন।
ইংরেজি স্যারের ক্লাস প্রায় সবাই পেয়ে থাকে। অর্থাৎ মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যÑ সকল গ্রুপের ছাত্ররাই তাঁর ক্লাস পেয়ে থাকে। তবে তিনি যেহেতু কলা বিভাগ থেকে ইন্টার পাশ করে ইংরেজিতে অনার্স, মাস্টার্স ও বিসিএস করে ইংরেজির শিক্ষক হয়েছেন, এজন্য কলা বিভাগের প্রতি তার দূর্বলতাও একটু বেশি। তাই তিনি কথার ফাঁকে বলে ফেললেন, তোমাদের প্রতিযোগীতা ইংরেজি, বাংলা, অংক ও সাধারণ জ্ঞানের উপর হলেও সাধারণ জ্ঞানের উপর নম্বর বেশি থাকায় কলা বিভাগের ছেলেরাই পরীক্ষায় ভালো করবে আশা করছি। তার এমন বক্তব্যে বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা রীতিমতো হতাশ হয়েছে। অনেকের মন্তব্য হলো, তাহের স্যার একটি গ্রুপের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। তাকে ইংরেজি বিষয়ের বিচারক করা যাবে না। তাহের স্যার সকলের শিক্ষক, তার এমন মন্তব্য ছাত্রদের জন্য যথাযথ ছিল না।
যা হোক, আশিক দমে যাবার ছেলে নয়। তাই সে বুঝতে পেরেছে স্কলারশিপ পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার হবে না। বিষয়টি সে খুব সিরিয়াসভাবে গ্রহণ করেছে। আর সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে, যেভাবেই হোক, সকল বিষয় ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে হবে এবং জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আশিকের কঠিন বিষয় ছিল বাংলা। বাংলা ব্যাকরণ তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হতো। যেমন, একদিন বাংলা শিক্ষক সমাস পড়াচ্ছেন। আশিক বারবার বুঝার চেষ্টা করেও দ্বন্দ সমাস বুঝতে সক্ষম হয়নি। অবশেষে সে একাধারে দু’মাস তার চাচা বাংলার তুখোড় শিক্ষক অধ্যাপক দবিরের কাছে বাংলা বিষয় আত্মস্থ করে নেয়। অবশ্য আশিকের বাবা ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক হলেও চাচা বাংলা বিভাগের নামকরা শিক্ষক। তার টেবিলে পড়তে এসে এমন কোনো ছেলেমেয়ে নেই যে, বাংলায় এ-প্লাস পায়নি। আশিক চাচার টেবিলেই রীতিমতো বাংলা অধ্যয়ন করছে। পরীক্ষা শুরু হবে ঊনত্রিশে জুলাই। সকলে মিলে প্রতিযোগীতার জন্য ব্যস্ত। একজন শিক্ষক হঠাৎ মহাবিদ্যালয়ের পাশে আশিকের বাবার বাসায় গিয়ে উপস্থিত। তিনি জানতেন, আশিকের বাবা তুহিন সাহেব একজন শিক্ষক এবং উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাও বটে, তাই তিনি ইংরেজি বিষয়ের স্যারের ব্যাপারে নালিশ করলেন। তুহিন সাহেব উত্তরে বললেন, আমি তো কলেজে চাকরি করি না, তবুও খবর নেব।
যথাসময়ে পরীক্ষা হয়ে গেল। সবাই যে যার মতো করে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। সাধারণত এধরণের পরীক্ষার ফলাফল নব্বই দিন বা তিন মাসের মধ্যে পাওয়া যায়, কিন্তু এবার একটু দেরি হওয়ায় আশিক এরই ভেতর বোর্ড স্কলারশিপ পেয়ে গেল। যাক এতে মা-বাবাও ভীষণ খুশি। পুরো কলেজে বোর্ড স্কলারশিপ পেল মাত্র দুজন। একজন আশিক, অন্যজন সিদ্দিক। সে খুবই দরিদ্র পরিবারের সন্তান।