নবীন লেখক হিসেবে সেরা ‘চলমান ভোজের শহর’ প্যারিসে প্রারম্ভিক বছরগুলোর স্মৃতিকথা হিসেবে যা লিখতে চেয়েছিলেন হেমিংওয়ে, তাঁর পাঠকদের নতুন প্রজন্মের (আশা করা যায়, আর কখনোই একটা পরাজিত প্রজন্ম আসবে না!) কাছে এবারে একটা সুযোগ এসেছে, সেই মূল পাণ্ডুলিপির মালমসলা নিয়ে স্বল্প সম্পাদিত এবং প্রায় পূর্ণাঙ্গ একটা প্রকাশিত ভাষ্য পড়ার।
আদি যুগ থেকে সাহিত্যের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির বিভিন্ন সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে আসছে। ধরা যাক বাইবেলের কথা। ছোটবেলায় কাউন্টি কর্কে জন্ম নেওয়া আমার নানি মেরি ডাউনির রোমান ক্যাথলিক ধর্মের মধ্যে বড় হচ্ছিলাম, তখন রোববারের বয়ানের সময় এবং ভোজের দিনগুলোতে বেদি থেকে পড়তে শুনতাম, নিজেও পড়ে দেখেছি, বাইবেলের কিং জেমস ভার্সনটি পুরোপুরি না হলেও ডুয়ে রেইমস ভাষ্যটি ছিল লাতিন ভালগেট সংস্করণের প্রায় কাছাকাছি। কেবল প্রথম দুটো পঙ্ক্তি দেখতে পারি আমরা।
ডুয়ে রেইমস ভাষ্য
১. শুরুতেই স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করিলেন ঈশ্বর।
২. এবং পৃথিবী ছিল নিরাকার ও শূন্য এবং অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি। আর সেই জলরাশির ওপর ভাসিয়া বেড়াইতেছিল ঈশ্বরের আত্মা।
কিং জেমস ভাষ্য
১. শুরুতেই স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করিলেন ঈশ্বর।
২. এবং পৃথিবী ছিল শূন্য ও ফাঁকা এবং অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি; এবং ঈশ্বরের আত্মা ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল জলরাশির ওপর।
লাতিন ভালগেট ভাষ্য
১. প্রারম্ভেই ঈশ্বর সৃষ্টি করিলেন স্বর্গ ও পৃথিবী।
২. এবং পৃথিবী ছিল নিরাকার ও ফাঁপা, জলরাশির ওপর ছিল অন্ধকার। এবং ঈশ্বরের আত্মা ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল জলরাশির ওপর।
এই তিনটি ভাষ্যই গুগলে খোঁজাখুঁজি করে আমার কাছে পরিষ্কার মনে হলো যে লাতিন ভাষ্যের দ্ব্যর্থকতার কারণে আমার কাছে একটা পথ খোলা আছেÑভাসমান শৈবালের মতো জলপ্রবাহের ওপর ঈশ্বরের আত্মার ঘুরে বেড়ানো কিংবা দক্ষিণ সাগরের ওপর অ্যালবাট্রস পাখির মতো ওড়াÑএই দুই ভাষ্যের মধ্যে কোনো একটা বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে আমার। যেকোনোভাবেই হোক, উড়ে বেড়ানোটা আমার কাছে বেশি ঈশ্বরপ্রতিম মনে হয় এবং স্পষ্টতই কিং জেমস ভাষ্যের প্রোটেস্ট্যান্ট পাদরিরা একই রকম ভেবেছিলেন। প্রোটেস্ট্যান্ট কিংবা ক্যাথলিকদের কেউই এ রকম দ্ব্যর্থক বিষয়ের অর্থ খোঁজার জন্য ঈশ্বরের কাছে যেতে পারেন না। হেমিংওয়ের বিষয়েও ব্যাপারটা একই। তাঁর স্মৃতিকথার একটা ভূমিকা, অধ্যায়গুলোর শিরোনাম, একটা সমাপ্তি এবং শিরোনামের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগেই মারা গিয়েছিলেন তিনি। হাডসনের১ ফার অ্যাওয়ে অ্যান্ড লং-এর বুড়ো রাখালের মায়ের মতো এসব বিষয়ে কেউই তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারেননি।
এখন এই শিরোনামটা নিয়ে কী বলব আমি? অ্যারন হচনারের কাছে স্বামীর করা মন্তব্য থেকে মেরি তুলে নিয়েছিলেন নামটা : ‘তুমি যদি যুবা বয়সে প্যারিসে বাস করার মতো ভাগ্যবান হও, তাহলে পরবর্তী জীবনের বাকি দিনগুলোতে যেখানেই যাও না কেন, শহরটা তোমার সঙ্গেই যাবে। কারণ, প্যারিস হচ্ছে চলমান ভোজের শহর।’
বাবা যখন আমার মা পলিনকে বিয়ে করার মতো স্বাধীন ছিলেন, রোমান ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হয়ে প্যারিসে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। অবশ্য সহিভাবে বেড়ে ওঠা প্রোটেস্ট্যান্ট হিসেবে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় আচার পালনের শিক্ষা পেয়েছিলেন বালক হেমিংওয়ে। তবে ইতালীয় যুদ্ধের মাঠে গোলার আঘাতে আহত হওয়ার পরের রাতে শুশ্রƒষাকেন্দ্রের এক ক্যাথলিক যাজকের কাছ থেকে শেষকৃত্যের আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে বয়ান শুনেছিলেন তিনি। প্যারিস স্মৃতিতে যে ফরাসি রাজার ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন হেমিংওয়ে, তাঁর মতো তিনিও জানতেন যে পলিন ছিলেন উপাসনাযোগ্য।
আমার মনে হয়, প্যারিস অ্যাপার্টমেন্টের কাছের যে গির্জার প্রার্থনাসভায় যেতেন পলিন, খুব সম্ভবত সেই সাঁ সুলপিসের পাদরি নিজের ভূমিকাটা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। আমার বাবার সঙ্গে যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলতেন তিনি, তার একটা ছিল চলমান ভোজ। তিনি ব্যাখ্যা করতেন ইস্টারের নানান তারিখের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এসব ছিল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ভোজ, তাই সেসবের নানান দিবসও থাকে। হেমিংওয়ে নিশ্চয়ই তখন শেক্সপিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় বাণীগুলোর একটার কথা মনে করেছিলেন, সেন্ট ক্রিসপিনের২ ভোজ, যেখানে পঞ্চম হেনরি তাঁর বাহিনীর উদ্দেশে আজিংকো ভাষণটা দিয়েছিলেন। সেন্ট ক্রিসপিন দিবসটা চলমান ভোজের দিন নয়। এটা প্রতিবছরের ক্যালেন্ডারের একই দিন, তবে সেই দিন যদি আপনি যুদ্ধ করেন, সেটা হয় আপনার চলমান ভোজ। চলমান ভোজের জটিলতাটা রয়েছে প্রতিবছর ইস্টারের তারিখ নির্ধারণের হিসাবের মধ্যে, যেখান থেকে খুবই সহজ হয়ে যায় কোনো নির্দিষ্ট বছরের প্রতিটি চলমান ভোজের তারিখ নির্ধারণ করা। ইস্টারের সাত দিন আগে পড়ে পাম সানডে৩।
ইস্টারের তারিখ ঠিক করা কোনো সহজ ব্যাপার নয়। এই হিসাবের একটা বিশেষ নাম আছে, কম্পিউটাস। জোহান কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসের৪ মতো একজন গণিতবিদ এই হিসাবের গণনাপ্রণালির নাগাল পেয়েছিলেন। এই দুই ওস্তাদ ও শিষ্য নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে এসব নিগূঢ় আলোচনা উপভোগ করতে পেরেছিলেন। আমি ভাবি, জেমস জয়েস যদি এই আলোচনায় যোগ দিতে পারতেন! পরবর্তী জীবনে হেমিংওয়ের জন্য একটা চলমান ভোজের ধারণা হয়ে ওঠে সেন্ট ক্রেসপিনের রাজা হেনরি যা চেয়েছিলেন, প্রায় তার মতো : ভোজের দিন হবে ‘আমরা সুখী কজন’-এর জন্য : একটা স্মৃতি কিংবা এমন একটা অবস্থা, যা আপনার একটা অংশ হয়ে উঠেছিল, সেটা সব সময়ই রাখতে পারতেন আপনার সঙ্গে, আপনি যেখানেই যান, তার পরে যেভাবেই বেঁচে থাকেন অনন্তকাল ধরে, কখনোই হারাবেন না আপনি। কোনো স্থানে বা কালে প্রথম যখন একটা অভিজ্ঞতা ঘটে অথবা ভালোবাসা কিংবা সুখের মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়, আপনি সেই স্থান বা কালের যেখানেই যান, পরবর্তী সময়ে সেটাই আপনার সঙ্গে যেতে পারে। প্যারিস ছাড়াও হেমিংওয়ের অনেকগুলো চলমান ভোজের শহর ছিল : যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে ব্রিটিশ ও মার্কিন বাহিনীর নর্মান্ডিতে নামার সেই প্রলয়ের দিনে অনেকের সঙ্গে ওমাহা সৈকত অভিমুখে একটা যুদ্ধজাহাজে। এটার জন্য আপনার দরকার হয় স্মৃতিশক্তির। স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে জানার সঙ্গে সঙ্গে হতাশা আসার আশঙ্কা প্রবল, এটা যেন পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে পাপ। ইলেকট্রিক শক থেরাপি স্মৃতিকে নষ্ট করে দিতে পারে, যা ঘটে স্মৃতিভ্রংশ কিংবা মৃত্যুর কারণে। তবে স্মৃতিভ্রংশ বা মৃত্যু না হলেও আপনার জানা হয়ে যায় যে নষ্ট হয়ে গেছে আপনার স্মৃতি।