রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চতুরঙ্গ’ একটি দার্শনিক-সাহিত্যকেন্দ্রিক উপন্যাস, বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য সৃষ্টি। যেখানে মানুষের মনের গভীর টানাপোড়েন, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, প্রেম ও দুঃখ, যুক্তি ও ভক্তির দ্বন্দ্ব একসঙ্গে মিশে আছে। নামের মতোই চারটি চরিত্র―শচীশ, দামিনী, জগমোহন ও শ্রীবিলাস―এখানে শুধু মানুষ নয়, একেকটি জীবনদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের চারজনের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ও অনুভব মিলেই গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসের দার্শনিক কাঠামো।
শচীশের ভক্তিময় মন, দামিনীর প্রেমময় আবেগ, জগমোহনের দৃঢ় যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আর শ্রীবিলাসের মানবিক আত্মকথন―সব মিলিয়ে চতুরঙ্গ পাঠককে এক অন্তর্মুখী ভ্রমণের পথে নিয়ে যায়। এখানে কেবল গল্পের ঘটনা নয়, আছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, যা মানুষকে তার নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে। প্রেম, বিশ্বাস, ভক্তি, সন্দেহ, বিদ্রোহ ও মানবিক টানাপোড়েন―সবকিছু মিলেমিশে উপন্যাসটি এক গভীর দর্শনধর্মী আলোচনায় রূপ নিয়েছে।
এই কাহিনিতে রবীন্দ্রনাথ শুধু গল্প বলেননি, বরং মানুষের অন্তর্গত সত্যের অনুসন্ধান করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ধর্মের অন্ধ অনুশাসন, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তি, নিঃস্বার্থ ভক্তি ও প্রেম―এসবই মানবজীবনের একেকটি দিক। কিন্তু তাদের সংঘাত ও সামঞ্জস্যের ভেতর দিয়েই মানুষ তার প্রকৃত সত্তাকে চিনে নেয়। চতুরঙ্গ পড়তে পড়তে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের জীবন একরৈখিক নয়―এটি বহুমাত্রিক, বহুস্বরিক। ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রেম কিংবা বিদ্রোহ―সবই মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ। রবীন্দ্রনাথ এই চার দিককে এমনভাবে মিশিয়েছেন, যাতে উপন্যাসটি হয়ে ওঠে জীবনের জটিল সত্যের প্রতীক।
চতুরঙ্গ কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি মানবমনের এক চিরন্তন যাত্রা, যেখানে প্রশ্ন আছে, উত্তর আছে, আবার প্রশ্নকে ছাপিয়ে যায় জীবনের বিস্তৃত রহস্য―যা পাঠককে ভাবায়, আলোড়িত করে এবং জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে (২৫ বৈশাখ ১২৬৮) কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভারতীয় মনীষী এবং বিশ্ববিখ্যাত কবি। ছাপার অক্ষরে স্বনামে তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দু মেলার উপহার’ (৩০.১০.১২৮১ ব.)।
১৮ বছর বয়সের মধ্যে তিনি ‘বনফুল’, ‘কবিকাহিনী’, ‘ভানুসিংহের পদাবলী’, ‘শৈশব সংগীত’ ও ‘রুদ্রচণ্ডু’ রচনা করেন। ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভুবনমোহিনী প্রতিভা’ তাঁর প্রথম গদ্য প্রবন্ধ। ‘ভারতী’র প্রথম সংখ্যায় তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘ভিখারিণী’ এবং প্রথম উপন্যাস ‘করুণা’ প্রকাশিত হয়। ২২ বছর বয়সে নিজেদের জমিদারি সেরেস্তার এক কর্মচারীর একাদশবর্ষীয়া কন্যা ভবতারিণীর (পরিবর্তিত নাম মৃণালিনী) সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় (৯.১২.১৮৮৩)। পুত্র রথীন্দ্রনাথের শিক্ষা-সমস্যা থেকেই কবির বোলপুর ব্রহ্মচর্য আশ্রমের সৃষ্টি হয় (২২.১২.১৯০১)। সেই প্রতিষ্ঠানই আজ ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’-এ রূপান্তরিত হয়েছে।
১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ বা ‘ঝড়হম ঙভভবৎরহমং’ প্রকাশিত হয়। ১৯১৩ সালের অক্টোবরে প্রথম ভারতবাসী রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট (১৯১৪) এবং সরকার স্যার (১৯১৫) উপাধিতে ভূষিত করে।
রবীন্দ্রনাথের একক চেষ্টায় বাংলাভাষা সকল দিকে যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের দরবারে সগৌরবে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করেছে। কাব্য, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান প্রত্যেক বিভাগেই তাঁর অবদান অজস্র এবং অপূর্ব। তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার, নাট্যপ্রযোজক এবং স্বদেশপ্রেমিক। তাঁর রচিত দুই হাজারের ওপর গানের স্বরলিপি আজো প্রকাশিত হচ্ছে। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের (ভারত ও বাংলাদেশ) জাতীয় সংগীত-রচয়িতারূপে একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই নাম পাওয়া যায়।