আমাদের বিদ্যাচর্চায় স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্ব এখনো বিশেষ উপলব্ধ হয়নি। তা যেন ইতিহাসের পেছনপটের মতো কিছু একটা। কেন্দ্রীয় ইতিহাসের বাইরে এই যে ইতিহাস তার গুরুত্ব তো নেহায়াত অল্প নয়। হাল আমলে তাকে সাব-অলটার্ন স্টাডিজ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আবার ইতিহাস বলতে তো আমরা শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসকেই বুঝি। সেখানে সাহিত্যচর্চার ইতিহাস তথা বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার বৃত্তান্ত নিঃসন্দেহে নব সংযোজন। এই গ্রন্থ তুলে ধরেছে আরও বহু গ্রন্থের সম্ভাবনাকে, নিশ্চয় লেখক সেই অবারিত প্রান্তরে ঘুড়ি ওড়িয়ে দেবেন- সমাজকে সমৃদ্ধ করে তুলবেন সংস্কৃতির আলোয়-সাহিত্যের সুদৃঢ় বুনিয়াদে।
মোজাম্মেল বিশ্বাস এই মাটির সন্তান- এই অঞ্চলের জল-হাওয়া-মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা। এই লোকসভ্যতার সুর ও স্বর খুব চেনা। তাই এই গ্রন্থরচনা সেই অর্থে তাঁর পক্ষে সহজতর হয়েছে। শুধু সাহিত্য নয়, পুরো দিনাজপুরসত্তাকে ধারণ করেছেন তিনি। তাঁর রচনার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য- তথ্যনিষ্ঠা ও সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ। এই দুইয়ের মেলবন্ধন গ্রন্থটিকে দিয়েছে বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তি ও শক্তি। অপরাপর মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর রচনাকে অভিষিক্ত করেছে সর্বজনীন মর্যাদায়।
মোজাম্মেল বিশ্বাস ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি-অন্বেষায় ইতোমধ্যে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। কথায় চিড়া ভেজানোর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে বর্তমান গ্রন্থটি তাঁর সাহিত্যনিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ফসল। সাহিত্যের অধ্যাপক তিনি, চিন্তা করেন সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে। দেশ-কাল-সমাজের কাছে তার রয়েছে অপার অঙ্গীকার। স্থানীয় সাহিত্যিকরা যে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন নানাবিধ অর্গল ভেঙে, নানান অচলায়তনকে অতিক্রম করে চেয়েছিলেন মনুষ্যত্বের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে তারই রূপ-রূপান্তর তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক। কালে ও কালান্তরে এই গ্রন্থ তাই স্মরণীয় মূল্য পাবে।
এই ঢাউস গ্রন্থের ভূমিকা রচনা গৌরবের নিশ্চয়। তারচেয়েও বেশি সৌরভের বিষয়, বাঙালির শিল্পসাধনার ভুবনে যোগ হলো আরেকটি কণ্ঠ। হয়তো দূরবর্তী অঞ্চলের অনুচ্চস্বর। তবু এর মূল্য কি কম? ইতিহাসের শক্তি অর্জনে কেন্দ্র ও প্রান্ত তো সবসময় পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে রাখে।
স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধ্যানী গবেষক মোজাম্মেল বিশ্বাসের জন্ম ১৫ ডিসেম্বর ১৯৬৬। পিতা তোফাজ্জল হোসেন, মাতা জবেদা খাতুন। তিনি চেরাডাঙ্গী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক, দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৮৭ সালে স্নাতক ও ১৯৮৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে চিলাহাটি সরকারি কলেজ, নীলফামারী ও ১৯৯৭ সাল থেকে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দিনাজপুর সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে পরবর্তীতে আবার তিনি ২০২৪ সালের নভেম্বরে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু ২০২৫ এর এপ্রিলে তিনি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অধ্যক্ষ পদে বদলী হয়ে বর্তমানে কর্মরত বোনার পাড়া সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার সাথে সম্পৃক্ত। প্রকাশিত গ্রন্থ- আঁধার পোড়ানো কোরাস, শেকড়গুচ্ছের সবুজ ভ্রমণ, হৃদয়ঘাটে প্রেম যমুনার পদ্ম, অন্তরলোকে অন্য মানুষ, শীতরোদে কাকদৃশ্য, ঘরহীন ঘোরে এ কোন মায়ার সংসার, দিনাজপুরে ভাষা-আন্দোলন, দুন্দুভি, সম্পা. সঙ্কলন, ২০০০, অগ্নিসেতু, সম্পা. সঙ্কলন, ২০১২, অগ্নিসেতু, সম্পা. সঙ্কলন, ২০১৪, দিনাজপুর জেলা গেজেটিয়ার, সম্পা. গবেষণা, ২০১৪। গবেষণা গ্রন্থ : গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জেলা জরিপ : দিনাজপুর, দিনাজপুরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ, জিন্দাপীর গণহত্যা। সংসারসঙ্গী সালেহা খাতুন লতা এবং সন্তান মনীষা হক, মহিমা হক ও সৌমিক হক নিয়ে তাঁর ঘর-সংসার।