জীবনের আদি সত্য—আমরা সবাই অসম্পূর্ণ, তবুও ওই অসম্পূর্ণতার মাঝেই লুকিয়ে আছে পূর্ণতার আলো। মানুষ যত বুঝতে শেখে, ততই সে উপলব্ধি করে, অহংকার সবচেয়ে ভারী বোঝা, ক্ষমা সবচেয়ে হালকা পথ, আর ভালোবাসাই একমাত্র শক্তি যা মৃত্যু পর্যন্ত নিষ্ঠুর হতে দেয় না।
জীবনে যে ক্ষতি কখনো পুরো ক্ষতি নয়, আবার লাভও কখনো পুরো লাভ নয়। যে সুখ আসে ক্ষণিক সূর্যের মতো, আবার দুঃখও চিরকাল থাকে না, সবই বদলায়, সবই চলে যায়, সবই ফিরে আসে অন্য নামে, অন্য চেহারায়। সেই জীবনে নিজেকে হারিয়ে আবার নিজেকেই খুঁজে পাওয়ার এক অন্তহীন যাত্রা। এখানে সবচেয়ে বিজয়ী মানুষ সে-ই নয় যে সবচেয়ে বেশি কিছু পায়। বরং সে-ই যে নিজের অন্ধকারকে চিনেও তার ওপর আলো ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত জীবন আমাদের একটাই শিক্ষা দেয়–আমরা কেবল পথিক, আর গন্তব্যের চেয়ে পথ চলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গন্তব্যে যাই থাকুক, পথেই মানুষ তার রূপ, তার সুখ, তার মুখোশ, তার চরিত্র, তার সত্য, তার স্মৃতি খুঁজে পায়।
কবির বক্তব্য
বিভ্রমের প্রাচীর–নামটি বেছে নেওয়ার পেছনে কেবল কাব্যিক রোমাঞ্চ বা প্রতীকী আবেদন নয়; এর মধ্যে আছে এক অনিবার্য দায়–নিজেকে, নিজের সময়কে এবং সমাজের প্রতিটি মুখোশকে প্রশ্ন করার সাহস। কবিতা রচনার যে পথ নিয়েছি, তা কখনই সরল বা নির্ভুল ছিল না; এর ভেতর দিয়ে হেঁটেছি দ্বিধা, ভ্রান্তি আর আত্মসংকোচের বহু গোলকধাঁধা পার হয়ে। তবু নীরবতার আরামে আশ্রয় নেওয়ার চেয়ে, আমি বেছে নিয়েছি আত্মসমালোচনার অগ্নিপথ–যেখানে শব্দই হয়ে উঠেছে আত্মমোচনের হাতিয়ার।
এই সংকলনে রাজনীতির জটিলতা, সমাজসংস্কারের প্রয়োজন, ধর্মের মানবিক ব্যাখ্যা, ন্যায় ও ন্যায়কারীর দায়বদ্ধতা–সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে। তবে এখানেই থেমে থাকা যায়নি; কারণ উপলব্ধি করেছি, বাইরের অন্যায়, ধর্মীয় গোঁড়ামি কিংবা নৈতিক অবক্ষয়কে ভাষায় ধরা যথেষ্ট নয়–নিজের ভেতরের বিভ্রমকেও চিনে নিতে হয়।
বিভ্রমের প্রাচীর কেবল সমাজের প্রতিচ্ছবি নয়, কবির নিজের মানসিক দুর্গের ভাঙন আর পুনর্গঠনের এক যাত্রা।
এখানে প্রতিটি কবিতা যেন একেকটি আত্মসমালোচনার আয়না, যেখানে আমি নিজেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি–কখনো অভিযুক্ত, কখনো সাক্ষী, কখনো বিচারক হিসেবে। কারণ বিশ্বাস করি, কবিতা নিছক অলঙ্কার নয়; তা হতে পারে চিন্তার পুনর্বিন্যাস, বিবেকের পুনর্জাগরণ, আর ভ্রান্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক শিল্পিত প্রয়াস।
আমাদের ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক সংকট–সবকিছুকে তাই কেবল সমালোচনার দৃষ্টিতে নয়, আত্মসম্মুখীনতার আবহে বিচার করার প্রয়াস এই গ্রন্থে আছে।
পাঠকের প্রতি অনুরোধ–এই বইকে কেবল পাঠ্য নয়, প্রতিফলনের আয়না হিসেবে দেখুন। বিভ্রমের ঘোর থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন বাইরের দৃশ্য নয়, নিজের অন্তর্গত অন্ধকারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে–তেমনি যদি একটি কবিতাও আপনাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে–নিজেকে, সমাজকে কিংবা বিশ্বাসকে–তবে এই প্রয়াস আংশিক হলেও সার্থক বলে মনে করি।
–কবি