জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূর্য তুল্য সমুজ্জ্বল প্রখর আলোক প্রদীপ আল-কুরআন। আর হাদীস সে আলো দ্বারা পথের দিশা লাভের মাধ্যম। অতএব, হাদীস শরীফ ইসলামী শরীয়তের অপরিহার্য উৎস এবং ইসলামী জীবন বিধানের অন্যতম মূলভিত্তি। কুরআন মাজীদে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যে মূলনীতি পেশ করা হয়েছে, রাসূলের হাদীসে তারই বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। অতএব, যেহেতু শরীয়তের বিধি-বিধানে কুরআনের পরই হাদীসে রাসূলের গুরুত্ব ও মর্যাদাগত অবস্থান, তাই আমরা যেভাবে কুরআন মুখস্থ করার মাধ্যমে কুরআন হেফাজতের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকি, তেমন ইলমে হাদীসের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে হাদীসে রাসূল হেফাজতের প্রতিও আমাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, ইসলামের কুচক্রী শত্রুরা যেসব জাল হাদীস প্রচার-প্রসার করেছে এবং সরলমনা আলেমগণের মাধ্যমে সেসব জাল হাদীস সমাজে ও বিভিন্ন দ্বীনী কিতাবে প্রবিষ্ট হয়েছে। কেবলমাত্র ইলমে হাদীসের মাধ্যমেই সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব। রাবীগণের জীবন-চরিত্র, হাদীসের মতন, সনদের ধারাবাহিকতা ইত্যাদির মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় কোনটি সহীহ হাদীস, কোনটি যঈফ হাদীস, কোনটি জাল হাদীস। মোটকথা কোন হাদীস কোন পর্যায়ের এসব বিষয় জানা যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বর্তমান যুগে আমরা অন্যান্য শাস্ত্রের প্রতি যতটা গুরুত্ব দেই ‘উলূমুল হাদীসের প্রতি ততটা গুরুত্ব দেই না। যার ফলে অধিকাংশ ছাত্র হাদীসের সনদ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা, রাবীদের হালাত নিয়ে পর্যালোচনা করা, হাদীসের ইল্লত জানা, কোন্ হাদীস কোন্ স্তরের ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করার আদৌ কোনো গুরুত্ব আছে বলে মনে করে না।
তবে আমাদের দরসে নেযামীতে উলূমুল হাদীস বিষয়ক সর্বপ্রথম যে কিতাবটি পড়ানো হয় সেটি হলো شرح نخبة الفكر নামে সুপরিচিত। ১। কিন্তু এ বিষয়ে ছাত্রদের পূর্বধারণা না থাকায় شرح نخبة الفكر নামক কিতাবটি পড়ে তার মর্ম
نزهة النظر في توضيح نخبة الفكر اذا যা জগৎ বিখ্যাত হাদিস রিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রচনা করেন। যা খোদ মুসান্নিফের শরাহ হওয়ার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বুঝা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। তা ছাড়া কিতাবটির উপস্থাপন যেহেতু প্রাচীন পদ্ধতিতে, তাই কিতাবটির ইবারতও অনেক ক্ষেত্রে সহজবোধ্য নয়।
তা ছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের ছাত্রদের মধ্যে যারা মেধাবী ও পরিশ্রমী তাদের মধ্যে অনেকেই যদিও হাদীসের পরিভাষার ব্যাপারে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে পারে যে, তারা কিতাব হাতে নিয়ে সুন্দর করে কিতাব বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাদের সামনে যদি কিতাব না থাকে, তাহলে অধিকাংশ ছাত্র ঐ বিষয়ে তেমন কিছু বলতে পারে না। কারণ, মুসতলাহুল হাদীস বিষয়ক সর্বপ্রথম তাদের হাতে যে কিতাবটি আসে সেটি হলো ‘শরহে নুখবাতুল ফিকার’। অথচ এ কিতাবটিতে বর্ণিত পরিভাষাগুলো যেমন সংক্ষিপ্ত, তেমন এর ইবারত অনেক ক্ষেত্রে সাবলীল নয়, তাই কিতাবটির ইবারত হল করতে করতেই ছাত্রদের বছর শেষ হয়ে যায়।
অথচ আগেই মুসতলাহুল হাদীস বিষয়ক কোনো একটি কিতাব পড়ে যদি ছাত্ররা সংক্ষেপে মূল বিষয়গুলো আয়ত্ত করে নিত, তাহলে পরবর্তীতে ‘শরহে নুখবাতুল ফিকার’ নামক কিতাবটি বুঝা তাদের জন্য যেমন সহজ হয়ে যেত, তেমন তারা এ বিষয়ে কিতাব সামনে না থাকলেও অনেক কিছু বলতে পারতো। তাই লাজনাতুল মুআল্লিফীনের ওলামায়ে কেরাম মুসতলাহুল হাদীস বিষয়ক এমন একটি কিতাব রচনার পরিকল্পনা হাতে নেয় যা পাঠ করে ছাত্ররা অতি সহজে মুসতলাহুল হাদীসের ব্যাপারে প্রাথমিক ও মৌলিক ধারণা লাভ করতে পারবে। ইনশা-আল্লাহু তা’আলা।
অতএব, ছাত্রদের নিকট মুসতলাহুল হাদীসের বিষয়টি সহজবোধ্য করে তোলার লক্ষ্যে শাইখুল হাদীস আল্লামা ইসমাইল সাহেব দাঃ বাঃ এবং মারকাজুল উলূমিল ইসলামিয়া (হাজীপাড়া) মাদরাসার উলূমুল হাদীস বিভাগের প্রধান ইউসুফ সাহেব দা: বা: এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে “সহজে হাদীসের পরিভাষা শিখি” নামক যে কিতাবটি রচিত হয়েছে, ছাত্ররা যদি সে কিতাবটি শরহে নুখবাহ পড়ার পূর্বে কিংবা পড়ার সময় মুতালাআ’ করে, তাহলে তাদের জন্য শরহে নুখবা কিতাবটি বুঝা সহজ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে এ ব্যাপারে তারা মাহারাত অর্জন করতে পারবে। ইন-শাআল্লাহ।