স্বপ্ন ও বাস্তবের সংঘাত এবং মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ আত্মত্যাগের আবহে সাজানো "স্বপ্নের ছায়াপথ" কেবল একটি সাধারণ গল্প নয়, বরং এটি সমকালীন নির্মম আয়না। মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, উচ্চশিক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস এবং ভালোবাসার অপূর্ণতার এক নিপুণ আখ্যান এই উপন্যাস। এর প্রতিটি পরতে রয়েছে এক তরুণের নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার করুণ ইতিহাস।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অরণ্য। তার স্বপ্নগুলো ছিল দিগন্তবিস্তৃত আকাশের মতো বিশাল, কিন্তু আটকে ছিল মধ্যবিত্তের শেকলে। অরণ্য যখন মেধার জোরে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে চেয়েছিল, তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ায় রূঢ় বাস্তব - অসুস্থ বাবার মুখ, মায়ের মলিন আঁচল আর ছোট ভাই আলভির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন, একজন মধ্যবিত্ত তরুণের কাছে 'ক্যারিয়ার' মানে কেবল নিজের উন্নতি নয়, বরং পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। অরণ্যের এই সংগ্রাম পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের সমাজে অধিকাংশ সময়ই ব্যক্তিগত ইচ্ছেকে বিসর্জন দিয়ে পরিবারের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করাটাই হয়ে ওঠে জীবনের একমাত্র ব্রত। এখানে স্বপ্ন দেখাটা যেন নিষিদ্ধ বিলাসিতা, আর দায়িত্ব পালন করাটাই চরম সত্য।
গল্পের শুরুটা হয় গ্রাম বাংলার এক মায়াবী পরিবেশে-যেখানে কুয়াশার নরম চাদরে ঢাকা মাঠ, বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা লালচে রোদ আর মেঠো পথের গ্রামীণ আবহে। এই প্রকৃতি অরণ্যের হৃদয়ের কোমলতার প্রতীক। কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে যখন অরণ্যকে ভবিষ্যত স্বপ্নের আহ্বানে শহরের যান্ত্রিক খাঁচায় বন্দি হতে হয়। শহর এখানে যেন এক দানব, যা মানুষের আবেগ আর সরলতাকে গিলে খায়। শহরের এই 'ইঁদুর দৌড়' এবং কৃত্রিমতার মাঝে অরণ্যের গ্রামীণ সহজ-সরল সত্তাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। পাঠক এখানে খুঁজে পাবেন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত,যেখানে শরীরটা শহরে থাকলেও মনটা পড়ে থাকে সেই সোঁদা মাটির ঘ্রাণে।
উপন্যাসের সবচেয়ে হূদয়স্পর্শী অংশ হলো অরণ্য ও তিথির প্রেম। তিথি - যাকে পাওয়া অরণ্যের কাছে ছিল এক পরম স্বপ্ন। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য আর অর্থনৈতিক দেয়াল তাদের মাঝখানে এক দুস্তর ব্যবধান তৈরি করে দেয়। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে আর শহরের ভিড়ে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে না পেয়ে অরণ্য এক চরম অস্তিত্বের সংকটে ভোগে। তার ডায়েরির সেই শেষ অমেয় বাক্য- "আমি আছি, কিন্তু নেই"-পাঠকের মনে এক দীর্ঘস্থায়ী কম্পন সৃষ্টি করে। এটি কেবল বিচ্ছেদের বেদনা নয়, বরং ভিড়ের মাঝে একজন মানুষের ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার দার্শনিক হাহাকার। অরণ্যের এই একাকীত্ব প্রতিটা সংবেদনশীল পাঠককে নিজের জীবনের কোনো না কোনো হারানো স্মৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে।
উপন্যাসের নামকরণ 'স্বপ্নের ছায়াপথ' গভীর রূপকতা বহন করে। মহাকাশের ছায়াপথ যেমন দূর থেকে দেখতে অপূর্ব ও মোহনীয়, কিন্তু বাস্তবে তা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে এবং অসীম শূন্যতায় ঘেরা; অরণ্যের জীবনটাও ঠিক তেমন। সে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চেয়েছিল, ঘর বাঁধতে চেয়েছিল তিথির সাথে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার প্রাপ্তির খাতাটা শূন্যই থেকে যায়। তার স্বপ্নগুলো মরীচিকার মতো তাকে প্রলুব্ধ করেছে, কিন্তু ঠিক যখনই সে হাত বাড়িয়েছে, তখনই তা মিলিয়ে গেছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে,স্বপ্নের ছায়াপথে ।
কাউসার খান সমকালীন সাহিত্যের এক সংবেদনশীল কথাকার, যার কলমে মধ্যবিত্তের না বলা আর্তনাদ, টানাপোড়েন আর যাপিত জীবনের রূঢ় বাস্তবতা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও শব্দের কারুকার্যে তিনি খুঁজে নেন প্রাণের স্পন্দন।
তিনি পেশায় একজন ব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) এবং একজন নিবন্ধিত কর আইনজীবী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি হিসাববিজ্ঞানে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে ইন্সটিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (ICMAB)-এ অধ্যয়নরত। সংখ্যার কঠিন হিসাব আর আইনি মারপ্যাঁচে যার দিন কাটে, তার হৃদয়ে যে এক চিরন্তন কবিত্ব আর জীবনবোধ খেলা করে, তার প্রমাণ মেলে তার সৃজনশীল লেখনীতে।
"স্বপ্নের ছায়াপথ" লেখকের দ্বিতীয় গ্রন্থ এবং প্রথম উপন্যাস। এর আগে ২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার কাব্যগ্রন্থ "মহাকালের ট্রাফিক মোড়", যা পাঠক ও সমালোচক মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখছেন সংবাদপত্রে। বর্তমানে তার দুটি কিশোর উপন্যাস প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্বপ্নবাজ, ভ্রমণপিপাসু ও সমাজসচেতন। যান্ত্রিক নগরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্পগুলোকে মলাটবন্দি করাই তার নেশা।