মানব ইতিহাসের নিয়ানডার্থাল সময়কাল হতে (প্রায় এক লাখ বছর আগে) ধর্ম মানবজীবনে একটি প্রভাবশালী বিষয় হিসেবে বিদ্যমান। বর্তমান সময়ে প্রতিটি ক্ষেত্র, প্রেক্ষাপট ও সামাজিক মানুষ বিপুল চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যেসব বিষয়কে বিদ্যমান ঘটনাবলি বা বস্তুগত উপাত্ত দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না, সেগুলো ব্যাখ্যার জন্য ধর্ম একটি সর্বজনীন কৌশল (Universal Tool)।
আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তিত হয়েছিল। সে সময় আরব দেশ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট বিধিব্যবস্থা ছিল। পরবর্তীকালে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর নানাবিধ নতুন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে অনেক বিভক্তি এসেছে। এক হিসেবে দেখা যায়, ইসলাম ধর্ম ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সত্তরটিরও বেশি ধারা বা ‘ফিরকা’র সৃষ্টি হয়েছে (মোহাম্মদ, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা: ৫৫)।
ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পর ক্রমান্বয়ে এর মধ্যে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার উদ্ভব হয়েছে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা, জগৎ-ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক এবং ইহজাগতিক জীবন দর্শনের ব্যাপারেও বহু পথ ও মতের সৃষ্টি হয়েছে (পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা: ৬০)। আহমদিয়া মুসলিম জামাত ইসলাম ধর্মের এই বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার একটি। এ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম আহমদ ১৮৮৯ সালে নিজেকে ইমাম মাহদি ও মসীহ দাবি করে কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই জামাতের সদস্য।
বাংলাদেশে ১৯১২ সালে আহমদিয়া জামাতের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরু থেকেই আহমদিয়া-বিরোধী আন্দোলন ও আহমদিয়াদের হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করার জন্য বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। আহমদিয়া-বিরোধী ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ প্রকাশ্য কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করলেও, তৎকালীন চার-দলীয় ঐক্যজোট সরকারের অপর শরিক দল ইসলামী ঐক্যজোট (ফজলুল হক আমিনী) এ বিষয়ে প্রকাশ্য কার্যক্রম চালিয়ে যেত।
সমাজ ও ধর্ম মানুষের জীবনে দুটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। সমাজ ছাড়া মানুষের যেমন কোনো পরিচয় নেই, ঠিক তেমনি ধর্ম ছাড়াও মানুষের পরিচয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কোনো কোনো সময় ধর্মই মানুষের জীবনে প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই ধর্মের সঙ্গে সমাজের ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, ধর্মের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখার চেষ্টা করা হয়েছে এই গবেষণায়। ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে কীভাবে ক্ষমতাচর্চা করা হয়, তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
আরও দেখার চেষ্টা করা হয়েছে—ক্ষমতা কীভাবে স্বীয় ধর্মের মধ্যে ‘অন্যতা’ (Otherness) নির্মাণ করে এবং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রবল জনগোষ্ঠী কীভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিক করে তোলে।