আব্দুল কাদির নেহাত একজন কবি হতে চাননি। হতে চেয়েছেন একজন ডাকসাইটে কবি। যার নাম-যশ-খ্যাতি থাকবে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল হতে না পারলেও নিদেনপক্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য; না, অতবড় কবি না হলেও দেশজোড়া খ্যাতি আছে, এমন কেউকেটা হতে পারলে মন্দ হতো না।
তিনি ভেবেছিলেন, পত্রিকায় কবিতা ছাপার ব্যাপারটা হবে ডাল ভাতের মতো। আর বিশেষ সংখ্যা মানেই তো তার লেখা কবিতা। ঈদসংখ্যায় কবিতা ছাপবেন বলে সাহিত্য সম্পাদকরা তাকে রীতিমতো বিরক্ত করবেন। টিভিওয়ালারা তাকে কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন সপ্তাহে সপ্তাহে। কাশ্মিরি শাল কাঁধের উপর চড়িয়ে, গলায় ঝোলা ব্যাগ ঝুলিয়ে তিনি হাজির হবেন টিভি স্টেশনে। আহ্! দারুণ ফ্যান্টাসি!
কিন্তু আব্দুল কাদির ডাকসাইটে কবি হতে পারেননি। যা হয়েছেন তা কবির ছায়ামাত্র। লোকে হয়তো কবি সাহেব নামেই ডাকে। তবে তা কেবলই মায়া। একখানা কবিতার বই বের হয়েছিল। চলেনি। বিক্রি বাট্টা কী হয়েছে, সে হিসাবও নেননি। তবে প্রকাশকের হাবভাব দেখে মনে হয়েছে কাদিরের কবিতার বই প্রকাশ করে তিনি বিরাট গুনাহর কাজ করেছেন। এই গুনাহ মাফ চেয়ে রোজ মাবুদের কাছে হয়তো পানাহ্ চান। চোখ-মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে যখন তার দিকে তাকান, তখনই সব সওয়াল জবাব লা-জবাব হয় অন্তরে। বইমেলায় স্টলে গেলে এক কাপ চা অফার করা তো দূরের কথা, চেয়ারে বসার চান্সই দেন না। প্রকাশক ধরে নিয়েছে কাদির বাতিল কবি। কবিতার নামে ছাইপাশ-জঞ্জাল প্রসব করা ছাড়া এই কবির আর কোনো ক্ষমতা নেই। সৃষ্টির আনন্দটা এই ব্যর্থ কবির খপ্পরে পড়ে একঘেয়ে, পানসে হয়ে গেছে।
কাদির বইমেলায় স্টলের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছেন। যদি কোনো ভক্ত বই কিনে অটোগ্রাফের জন্য তার সমীপে পেশ করেন।
নাহ্! কেউ আসেনি। শুকনো বিরস মুখ নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেছেন। পাশ কেটে যাওয়া তরুণীদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন একবিংশ শতাব্দীর ব্যর্থ কবি কাদির জিবরান।
আব্দুল কাদির কবি হওয়ার জন্য সেই শৈশব থেকে নানা কোশেশ-কসরত করেছেন। এই করতে করতে তার চুল ধবল বর্ণ ধরেছে। চুলে চড়েছে নানা কেশবতী তেল ও কৃত্রিম রঙের বাহার। যদিও চুলের সাদাকালো কম্বিনেশনে কবিভাবটা কিছুটা জারি থাকে, খেয়াল করেছে কাদির।
তার নামের মধ্যে নাকি একধরনের গ্রাম্যতা আছে। তাই কবি বন্ধুর পরামর্শে ‘কাদির জিবরান’ নাম ধারণ করে জাতে উঠতে চেয়েছেন। কিন্তু তাতেও ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি। লোকে নাম দেখে বুঝতে পারে না, বাংলা নাকি পার্সি ভাষার কবি! আফগান, ইরানি, নাকি আজারবাইজান থেকে নাজিল হয়েছেন— কেউ কেউ আড়ালে আবডালে ফিসফাস করে। কবিমহলে ঈর্ষা আর হিংসার ছোবল খুব ভয়াবহভাবে আছে, বোঝেন কাদির।
আব্দুল কাদির এখন জাবর কাটার মতো নিজের কবিতা পাঠ করে সময় কাটান। বৃষ্টি হলেই স্বর উঁচু করে খানিকটা আবৃত্তির চেষ্টাও করেন। স্বাভাবিক অবস্থায় আবৃত্তি করতে গেলে তার কর্কশ কণ্ঠের আওয়াজে গিন্নির পিত্তি জ্বলে কাবাব হতে পারে। সে আর এক বিড়ম্বনা!
আব্দুল খালেক ফারুক। জন্ম ১ নভেম্বর ১৯৭১। কুড়িগ্রাম জেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর হাঁটাচলা। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গান ও নাটক নিয়ে কাজ করে গেছেন একের পর এক। প্রকাশিত হয়েছে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায়। শিল্প-সংস্কৃতির অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সরব বিচরণ। লিখেছেন এগারোটি নাটক। গীতিকার হিসেবে ‘নাইওরী’সহ কয়েকটি ভাওয়াইয়া গানের অ্যালবামে তাঁর লেখা গান শ্রোতামহলে জনপ্রিয় হয়েছে। আধুনিক, ভাওয়াইয়া ও গণসংগীতসহ বিভিন্ন গান লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা কুড়িগ্রাম জেলার ব্র্যান্ডিং গান ‘হামার কুড়িগ্রাম’ দারুণ জনপ্রিয়। তিনি রংপুর বেতারের আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত গীতিকার। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত আছেন। একজন সফল সংগঠক হিসেবে তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কুড়িগ্রামের মুক্তি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, দিশারী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, দিশারী পাঠাগার, তরুণ লেখক ফোরামসহ বেশ কিছু সংগঠন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা, কুড়িগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরি সম্মাননা, রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদের সম্মাননা, সলিডারিটি সম্মাননা ও দিশারী সম্মাননা।