উঠোনে বড়োই বিমর্ষ হয়ে বসে বৃষ্টিবিলাস করছে এক রমণী। নদীর কোলে নীড় হারানো নারীর মতো সর্বস্বান্ত চাহনি তার। মুখখানা ফ্যাকাসে, মরা লাশের মতো। পরনে তার ধবধবে সাদা শাড়ি, ভেজা ঘোমটা লেপটে আছে মাথায়। নাক, কান, গলা অলংকারহীনতায় খাঁ খাঁ করছে। জাওয়াদের ভীষণ রাগ হলো তা দেখে। এমন বিধবার বেশ ধরার মানে কী? সে কি মরে গেছে?
ক্রুদ্ধতার সাথে সামনে গিয়ে বুঝল যেটাকে সে শাড়ি ভাবছিল সেটা আসলে শাড়ি না, ওড়না। পরনে তার হালকারঙা একটা জামা। যাক, ওকে মৃত ভাবেনি। একটু স্বস্তি পেল জাওয়াদ। অথচ ওর অস্থির হওয়া উচিত ছিল। প্রিয়তমে মৃত্যু হলেও নারীর গায়ে সাদা উঠে আর নিজের মৃত্যু হলেও। জাওয়াদ নিজেকে জীবিত ভেবে স্বস্তি পেল অথচ সে দেখল না সামনের মানুষটার মৃত্যু।
মুশরাফার নির্বিকার চিত্ত দেখে ফের মেজাজ বিগড়ে গেল। কাছে গিয়ে তীব্র রাগ নিয়ে ধমকে উঠল, ‘অ্যাই মুশরাফা! কী সমস্যা তোমার? আমার জীবনটা নরক বানিয়ে দিয়ে এখন এমন ভান করছ যেন আমি তোমাকে টর্চার করছি। কী চাও তুমি? আজ তুমি ক্লিয়ার বলবে।’
মুশরাফা উত্তর দিলো না। খেয়ালও করল না রাফা থেকে মুশরাফা হওয়াটা। হয়তো সেই খেয়ালই তার উদাসীনতার কারণ।
জাওয়াদ ফের ধমকে হাত ধরতেই ঘোর ভাঙল। পরক্ষণেই চৈত্রের শুকনো খড়ে মশাল ছুঁলে যেমন দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠে তেমন জ্বলে উঠল মুশরাফার চোখে। সাদা কাপড়ের আড়ালে ওই রক্তিম চোখদুটোকে এক মুহূর্তে জন্য মনে হলো অশরীরী।
ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে, শীতল গলায় বলল, ‘কী চাই আমি? আমি...তালাক চাই। এই মুহূর্তে আপনার স্ত্রী হয়ে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে আমার সহজ মনে হচ্ছে। কিন্তু স্বেচ্ছায় মৃত্যু তো আমি চাইতে পারি না। তাই স্বেচ্ছায় তালাক চাইছি। আপনার স্ত্রী উপাধি থেকে আমাকে মুক্তি দিন। প্রয়োজন যদি মনে না হয়, তবে অনুগ্রহ করে হলেও তালাক দিন। আমি আপনার ছায়া থেকেও মুক্তি চাই।’
কাছে কোথাও বজ্র পড়ল, সেই সাথেই বাজল মুশরাফার কথাগুলো। ওর চোখে এখন আর রাগ নেই। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্যকিছু, রাগ থেকেও বেশি কিছু। কী ওটা? ঘৃণা! জাওয়াদ এক জীবনে অনেক কিছু দেখেছে, কিন্তু এই চোখে কখনো ঘৃণা দেখেনি। সর্বদা ভালোবাসা ভাসা চোখে আজ ঘৃণার এত গাঢ় পারদ!
লেখক আফিয়া খোন্দকার। ডাকনাম আপ্পিতা। তিনি ২০০০ সালের ৩০শে মার্চ সম্ভ্রান্ত খোন্দকার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোসলেহ উদ্দিন খোন্দকার এবং মাতা তাহমিনা আক্তার। তিনি বাবা-মায়ের জমজ কন্যার একজনা। পৈত্রিক নিবাস-মির্জাপুরে। সাহিত্যের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল ছোটোবেলা থেকেই। বুঝতে শেখার পর থেকে বই তুলে নিয়েছিলেন হাতে। বইয়ের প্রতি নেশাটা লেখিলিখিতে রূপ নিয়েছে কৈশোরের সমাপ্তে এসে। বাস্তবতা এবং কল্পনার সংমিশ্রণে ভেতরকার শব্দগুলোকে গল্পাকারে রূপ দিতে থাকেন পড়াশোনার পাশাপাশি। ২০২১ সালে তাঁর লেখা প্রথম বইয়ের পাতায় আসে। রোমান্টিক থ্রিলার জনরায় লেখা বইটির নাম 'তারা ছয়জন।' ২০২২সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় বই। পাঁচ জনরার সাত গল্পের সংমিশে রচিত গল্পসংকলনের নাম, ‘সরোবরে পুষ্প ভাসে।’ ২০২৪ সালে প্রকাশ পায় তার তৃতীয় পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘পিঞ্জর’। ভিন্ন জনরার ভিন্ন ভিন্ন লেখা দিয়ে তিনি পাঠকমহলে নিজের স্থান অর্জন করেছেন। অনবদ্য লেখার মাধ্যমে ছুঁয়েছেন হাজারো পাঠকের হৃদয়ে।