আশুলিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন নিদিষ্ট সেক্টরের অধীনে ছিল না। বরং এটি ছিল ঢাকা-১৯ নির্বাচনী এলাকার অংশ (বর্তমানে ঢাকা- ১৪, ঢাকা - ১৯ এর আওতায়) যা মূলত সাভার উপজেলার অধীনে একটি থানা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা ও এর আশেপাশের অঞ্চলগুলো সেক্টর -২ এবং সেক্টর -৩ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আশুলিয়া সরাসরি কোন সেক্টরের সদর দপ্তর বা মূল যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না। বরং এটি মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘাতের একটি এলাকা ছিল।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিভিন্ন জেলা, শহর, গ্রামে ও বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি/সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। আবার কোথাও কোথাও খন্ড যুদ্ধ হয়েছে। আশুলিয়ায়ও অনেকগুলো সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বে বাচ্চু গ্রুপ, মতি গ্রুপ, হানিফ গ্রুপ, কাদের গ্রুপ, এবং অন্যান্য গ্রুপের সাথে পাকবাহিনীর। তেমনি বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কিছু সফল অপারেশন পাক হানাদার বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
আমার বাবা মো: জালাল উদ্দীন আহমেদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেই সুবাদে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়সে ছোট হলেও যেমন বাবার সহযোদ্ধা বন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের সংশ্রবে এসেছি। তেমনি জনৈক স্বাধীনতা বিরোধী কিছু লোক ও পাকসেনাদেরকে কাছ থেকে দেখার আতংকে কেটেছে আমার শৈশবের রাতদিন। কি করে চোখ থেকে মুছে ফেলি শৈশবের সেই ভয়ংকর যুদ্ধদিনের বিভৎস স্মৃতি।
বর্বর পাক বাহিনী কতৃক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া স্বজন হারিয়ে আশ্রয় নেয়া মিরপুরের ময়না ও ফরিদাকে যুদ্ধবিরোধীদের হাত থেকে বাঁচানোর আমার মায়ের প্রাণান্তকর চেষ্টা।
আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে না। তরুণ প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক, ত্যাগী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কাহিনী জানতে পেরে দেশপ্রেমে আরো উদ্ভুদ্ধ হয়। স্বাধীন জাতি হিসাবে দেশের জন্য অবদান রাখতে পারে। সে উদ্দেশ্যেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
অনেক তথ্যই হয়তো বাদ পড়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স হয়েছে। অনেকেই স্মৃতি কাতরতায় ভুগছেন। তবু আমি চেষ্টা করেছি এ স্বল্প পরিসরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়ে তাদের আত্মত্যাগকে কলমে তুলে ধরতে।
বইটি লিখতে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন এবং পরামর্শ ও তথ্য পরিবেশন করে সহযোগিতা করেছেন। এই জন্য সকলের নিকট অশেষ কৃতজ্ঞ।
১৯৭১ সালের ভয়ংকর সে দিনগুলোতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যে সমস্ত মানুষ রক্ত দিয়েছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, স্বজন হারানোর বেদনা সয়েছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধা রক্ত দিয়ে লড়াই করেছেন তাদের সকলের প্রতি রইল নিঃশব্দ শ্রদ্ধা।
জন্ম ঢাকা জেলার সাভার থানার ভাদাইল গ্রামে। বাবা জালাল উদ্দিন আহমদ-এর নাটকে সংশ্লিষ্টতার সুবাদে সৃজনশীল কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ময়মনসিংহ ভেটেরিনারি ইন্সটিটিউটে অধ্যয়ন শেষে পশু সম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত। এরপর তিনি University of Huddersfield and Commonwealth Secretariate In U.K হতে Youth Development-এ Post Graduate Diploma (DYDW) নেন। সংসার, সংগঠন এবং সংস্কৃতি কর্মীর দায়িত্ব পালন করেও শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেছেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। ছাত্রজীবনে বিভিন্ন কলেজ ম্যাগাজিন ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্তৃক প্রকাশিত সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশ পায়। এজন্য তিনি বহুবার পুরস্কৃত হন। এরপর সাপ্তাহিক বেগমসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক সমূহে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। কবিতায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৬-এ বাংলাদেশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পুরস্কার লাভ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি সৃজনী পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উদ্দীপন নামে একটি সাহিত্য সঙ্কলন সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শাওন ও তন্ময়-এর আম্মু। গ্রন্থাকারে এটি তাঁর চতুর্থ প্রকাশনা।