মোল্লা তোবারকের গ্লাসগোর ডায়েরি নিছক কোনো চিরাচরিত ভ্রমণকাহিনি নয়; বরং অজানাকে জানার কৌতূহল ও জীবনবোধের এক অনন্য মিশেল। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুবাদে সপরিবারে ইউরোপের নানা প্রান্তে লেখকের যে পথচলা, তারই নিখুঁত প্রতিচ্ছবি এই গ্রন্থ। প্যারিসের ব্যস্ত স্টেশন, আল্পসের হিমশীতল উপত্যকা কিংবা দানিয়ুবের নীল জলরাশি—ইউরোপের ইতিহাস ও প্রকৃতি তাঁর সাবলীল লেখনীতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি আইসিই ট্রেনের গতিময়তার সমান্তরালে মিশে আছে প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা আর শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার গোপন আর্তি।
বইটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সাহিত্যের সুধা। লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিটস, শেলি, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের পঙ্ক্তিমালা মিলে তৈরি হয়েছে এক ধ্রুপদি আবহ। বার্লিন প্রাচীরের গ্রাফিতির পাঠোদ্ধার থেকে শুরু করে ভিয়েনায় প্রবাসী বাঙালির নিগূঢ় মনস্তত্ত্ব—সবখানেই তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের ছাপ স্পষ্ট। এখানে একজন ইতিহাসবিদের নির্লিপ্ততার পাশাপাশি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে একজন পিতার সংবেদনশীলতাও।
নান্দনিকতার বাইরে বইটির একটি শক্তিশালী প্রায়োগিক দিক রয়েছে। বিদেশের মাটিতে আবাসন, যাতায়াত এবং ডিজিটাল জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি অত্যন্ত সহজবোধ্যভাবে উঠে আসায় এটি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমনেচ্ছুদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ‘গাইডবুক’ হিসেবে কাজ করবে। প্রবাসের জৌলুসে মোহগ্রস্ত না হয়ে স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বিশ্বজনীন দর্শনের যে বহিঃপ্রকাশ লেখক ঘটিয়েছেন, তা সত্যিই মুগ্ধকর। কাব্যময় গদ্যে রচিত এই ডায়েরিটি ভ্রমণ ও জ্ঞানপিপাসু—উভয় শ্রেণির পাঠকের জন্যই এক অমূল্য সংগ্রহ।