বাংলাদেশের নাট্যচর্চা মূলত সময়, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিফলন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ পরবর্তী সময়ে এই ভূখন্ডের নাট্যধারায় এক প্রাণবন্ত গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ের নাটকে জাতির আর্থ সামাজিক রূপান্তর, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ব্যক্তি ও সমাজের অস্তিত্ব সংকটের পাশাপাশি উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, নৈতিক অবক্ষয় ও আত্মপরিচয়ের পুর্নগঠনের প্রশ্ন। এই সময়ের নাট্যকারেরা একদিকে যেমন পাশ্চাত্য নাট্যরীতি, শৈলী ও কাঠামোর প্রভাব গ্রহণ করেছেন তাঁদের লেখায় তেমনি নিজ শেকড়ের অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে প্রাচ্য দর্শনকেও তুলে এনেছে। ফলে বাংলাদেশের নাটক হয়ে উঠেছে এক বহুমাত্রিক পাঠক্ষেত্র যেখানে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সংলাপ নিরন্তর চলমান।
বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্য নিয়ে বিপুল গবেষণা থাকলেও সমালোচনামূলক তত্ত্বকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট নাট্য পাণ্ডুলিপিগুলোকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণের উদ্যোগ খুব বেশি লক্ষ্য যায় না। ফলে এই গ্রন্থ পাঠককে শুধু নাটকের কাহিনি বা নান্দনিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে দেখাতে চায় যে, একটি নাটক কীভাবে সমসাময়িক ইতিহাসকে ধারণ করে, প্রতিরোধকে রূপ দেয়, মানুষের আত্মসংঘাতকে প্রকাশ করে এবং প্রতিফলিত করে নিজ আয়নায়। নাট্যটেক্সটকে সমালোচনামূলক তত্ত্বের আলোকে বহুমাত্রিকভাবে বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি পাঠক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তত্ত্ব-ভিত্তিক নাট্যবিশ্লেষণধর্মী চিন্তা উপস্থাপন করাই এই গ্রন্থের লক্ষ্য। এই গ্রন্থ সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।
গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে উপনিবেশ উত্তরকালীন বাংলা নাটকের আঙ্গিক, কাঠামো ও শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে। এরপরের অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে সমালোচনামূলক তত্ত্বের উৎপত্তি এবং সমালোচনামূলক তত্ত্ব ব্যবহার করে বাংলা নাট্য বিশ্লেষণ ও পাঠ প্রক্রিয়া সম্পর্কে। পরবর্তী অধ্যায়ে ১৯৪৭ উত্তর সময়ের নুরুল মোমেনের নেমেসিস, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ রচিত বহিপীর, সাঈদ আহমদ রচিত তৃষ্ণায়, আবদুল্লাহ আল-মামুন রচিত কোকিলারা, সেলিম আল দীনের চাকা ও নিমজ্জন, সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ও ঈর্ষা, মামুনুর রশীদ রচিত রাঢ়াঙ নাটকের পাণ্ডুলিপি সমালোচনামূলক তত্ত্বের আলোকে ব্যাখা করা হয়েছে।
এই গ্রন্থে নাটকগুলোর পাঠ শুধুমাত্র কাহিনি বা চরিত্র বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিভিন্ন সমালোচনামূলক তত্ত্বের আলোকে যেমন উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব, নারীবাদী দৃষ্টিকোণ, মার্কসবাদী সমালোচনা, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে। প্রতিটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ নাটকের অন্তর্গত ক্ষমতার সম্পর্ক, প্রতীকবিন্যাস, ভাষার কাঠামো, চরিত্রের মানসিক গঠন ও সমাজ-রাজনীতির অনুধাবনকে নতুনভাবে উন্মোচিত করে। এভাবে সমালোচনামূলক তত্ত্বের প্রয়োগ শুধু নাটকগুলোর ব্যাখ্যাকেই গভীর করে না; বরং একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, বাংলাদেশের নাট্যনির্মাণ কীভাবে সময়ের ইতিহাসকে ধারণ করে? সমাজ কি নাটকের ভূমিকাকে পুনর্র্নিমাণ করে, নাকি নাটকই সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখায়? নাট্য পাণ্ডুলিপি কেবল সাহিত্যের শিল্পরূপ হিসেবে নয় বরং সাংস্কৃতিক দলিল, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং মানবিক অভিজ্ঞতার জটিল গ্রন্থনা হিসেবে পাঠ করা যায় এই অনুসন্ধানই আলোচ্য গ্রন্থের মূল প্রয়াস।