বাইরে বৃষ্টি। আকাশের কি এক অদ্ভুত অভিযোগ। মন ভালো নেই। খণ্ড খণ্ড মেঘেদের বিদ্রোহ। গুমোট অন্ধকারে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো এক হয় অভিমানের জলের মতো আকাশের বুকে। অঝর ধারায় কাঁদছে আকাশ। অভিযোগ না-কি আহ্লাদের নেমন্তনে। জানে না সে। উষ্ণতার চিরকুট ভিজিয়েছে তৃষ্ণার জলে। আজ আকাশ আলো থেকে অনেক দূরে অশান্ত, বিভ্রান্ত। কেন তার মন ভালো নেই এই অমোঘ প্রশ্নের কোনো জবাবদিহিতা নেই। অভিমানের জলে ভাসছে পৃথিবী। নীরব নিঃস্তব্ধ চারপাশ, বৃষ্টিভেজা বিকেল। আশেপাশে কেউ নেই। মুখোমুখি দুজন। কেউ কোন কথা বলছে না। নারী এক অদ্ভুত রহস্যময় শান্ত বোবা নদী কিন্তু পুরুষ অনেকটা আবেগী ও দুর্দান্ত প্রেমী। পুরুষরা বুকের ভেতর অস্থির প্রেম পুষে। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো মনে তরঙ্গ সঞ্চার হয় যৌবনের। এখানেই পুরুষের বড়ো পরাজয় যে, তারা যৌবন ও জীবনের মূল্য বুঝে না। নারীর স্পর্শে তারা ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ে এবং বিসর্জন দেয় তাদের পৌরুষ সত্ত্বাকে। এক্ষেত্রে ভুলে যায় আত্মমর্যাদা ও আল্লাহর ভয়। হ্যাঁ, তেমনি শিহাবও ভুলে গেছে সে একজন নামাজী ও ঈমানদার মানুষ। তার চোখে আজ কামনার আগুন। স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায় ঝড় বয়ছে তার মনের ভেতর। শরীর কাঁপছে। তার কোনো ভয় নেই। না আছে পাপের ভয় কিংবা না আছে মান সম্মান হারানোর ভয়। সব উপেক্ষা করে তবুও এতটুকু স্পর্শের অনুভূতি চায় শিহাব। সে খুব ক্লান্ত ক্ষুধার্ত। বুকের মাঝে একটু আশ্রয়ের পরশ একটু আবেশের অনুভব চায় শিহাব।
ইতির চোখে আগুন নেই কিন্তু আকাঙ্ক্ষা আছে। চোখের কোণে জমে আছে আদিম প্রশ্ন। ডোরাকাটা ভেজাঠোঁটে শিশিরের রূপকথার গল্প। সেই গল্পের আড়ালে আছে না বলা কথা। বিস্মিত রাতের হাহাকার। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অবহেলিত আদিমত্তার ডাক। শরীরের কান্না থামাতে পারে না ইতি, শরীরও কথা বলে অমোঘ আহ্বানে। কজনই বা জানে সেই অবহেলিত পঞ্চচূড়া মনের ভেতরের লালিত অনুভবকে। কিন্তু শিহাব, হ্যাঁ; একদিনে অন্তত এতটুকু বুঝেছে ইতির পতিত মনের আর্তনাদ। ইতিরও বুঝতে বাকি নেই শিহাব তাকে বুঝে, তার মন, তার চাওয়া-পাওয়া, তার ভালো লাগা। সেজন্যই হয়তো ইতির মনে জায়গা করে নিয়েছে শিহাব। অথচ, বিবাহের সাত বছরেও তার স্বামী তাকে বুঝতে পারেনি বা কখনো তাকে বুঝার চেষ্টাটুকুও করেনি। স্বামীর ভালোবাসা কাকে বলে তা জানে না ইতি। স্ত্রীর মর্যাদা, অধিকার স্বামীর কাছ থেকে কখনো পাইনি সে। নারী শরীর একটি গল্পের মতো। এ-ই গল্পের ছন্দরা যখন উঁকি দিতো তখন বাক্যের বাতাসচক্রে স্বামীর ভালোবাসার পরশে তা আদৌ গল্পের শেষটা রচনা হতো না। অসমাপ্ত রয়ে যেতো রাতের চিত্রনাট্য। অযাচিত শূন্যতায় রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটতো ইতির। অপেক্ষা আর অবহেলায় তার মনে বেড়ে উঠত এক বকুল গাছ। বকুলের ঘ্রাণ নিতে অস্বস্তি বোধ করত তার স্বামী শামীম। গাছের ছায়ায় আশ্রয় খুঁজে নিতো না সে। যখন মন ক্ষিপ্ত হতো ঐ সঙ্গমের অনুশীলনটুকুই ছিল তার আবদার। ব্যস্ এটুকুই। হঠাৎ এই ঝড় কখনো কোনো নারীর খোরাক হতে পারে না। মনের গহিনে যে নীরব ঝড় বয়ে যায় তা আর থামে না ইতির। সেই বিয়ের রাত থেকেই বুঝেছে সে তার স্বামীর লুফে নেওয়া সাময়িক ভোগের পণ্য। এখনো তার স্ত্রী হতে পারেনি ইতি।