আশির দশকে বাংলাদেশের গ্রাম ও মফস্বলের বাস্তবচিত্র আজ সরাসরি দেখার উপায় নেই। তবে স্মৃতির মানসপটে ভেসে ওঠা সেই সময়ের চিত্রের ভিত্তিতেই ‘ফেলে আসা আশি’ বইয়ে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি প্রকৃতি, মানুষ, তাদের যাপিত জীবন, অর্থনীতি ও সমাজের কথা।
সেই সময়ের গ্রামীণ জীবন ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় গড়া সমাজে তখনও বাংলা ও বাঙালিয়ানা বহুলাংশে অটুট ছিল। নগর তখনও পুরোপুরি গ্রামকে গ্রাস করেনি, যদিও তার স্পর্শ শুরু হয়েছিল। মানুষই ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর এবং স্থানীয় হাটবাজার ছিল এর কেন্দ্রবিন্দু। সামাজিকভাবে মানুষ ছিল একতাবদ্ধ। স্বাস্থ্যসেবায় মানুষ অনেকাংশে স্থানীয় চিকিৎসার ওপর নির্ভর করত। শিক্ষার কদর ছিল, তবে উচ্চশিক্ষা ছিল সীমিত ও কষ্টসাধ্য; সেখানে মেধাই ছিল প্রধান মানদণ্ড। প্রকৃতিনির্ভর জীবন ছিল প্রাণবন্ত ও উচ্ছ্বল।
সময়ের প্রবাহে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় প্রযুক্তি ও নগরকেন্দ্রিক জীবন বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে কমেছে মানুষের হৃদ্যতা ও সামাজিক বন্ধন। তখন থেকেই মানুষ ধীরে ধীরে শহরমুখী হতে শুরু করে, যৌথ পরিবার ভাঙতে থাকে এবং মানুষ যুথবদ্ধ জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার পথে এগোয়।
তবুও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই সময়ের উৎসব, সামাজিক আচার, ফুল-পাখি, শস্য ও সবুজে ভরা প্রকৃতি—যার অনেক কিছু আজ বিলুপ্তপ্রায়। আশির দশকের জনজীবন, পরিবেশ ও অর্থনীতির পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আমরা আজকের সভ্যতায় পৌঁছেছি। সেই হারানো সময়ের স্মৃতিবিজড়িত অনুভূতি পাঠকের মনে পৌঁছে দিতেই এই প্রয়াস। অনেক বিষয় হয়তো স্মৃতির আড়ালে রয়ে গেছে; পাঠকেরা তা স্মরণ করিয়ে দিলে ভবিষ্যতে সেগুলোও সংযোজন করার আশা রাখি।