কবিতা সব সময় সমকালীন হয় না— অনেক সময় কবিতা সময়কে বহন করে। কখনো কখনো একটি কবিতার জন্ম হয় বহু বছর আগে, কিন্তু তার প্রকাশ পায় বহু পরে। তবু কবিতা তখনও পুরোনো হয় না; কারণ মানুষের অনুভূতির বয়স নেই। বৈরী হাওয়ায় ঠিক তেমনই একটি কবিতার বই— যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে ওঠা অনুভূতিগুলো আজ শব্দের শরীর পেয়ে পাঠকের সামনে হাজির।
এই গ্রন্থে সংকলিত ৭০টি কবিতা একদিনে লেখা নয়। এগুলো জন্ম নিয়েছে দীর্ঘ পনেরো থেকে বিশ বছরের যাত্রাপথে— যেখানে কৈশোর, তারুণ্য, পরিণত বয়স, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, আশা ও হতাশা পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে। কবিতাগুলো সেইসব দিনের সাক্ষী, যেদিন কবি প্রেমে পড়েছেন, যেদিন ভেঙে পড়েছেন, আবার যেদিন নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন— ভালোবাসা আসলে কী, আর মানুষ কেন বারবার আঘাত দিয়েও প্রিয় হয়ে থাকে।
বৈরী হাওয়ায় নামটি কেবল একটি রূপক নয়; এটি এই কবিতাগুলোর অন্তর্গত সুর। এখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তা সব সময় কোমল নয়। এখানে নারী আছে— প্রিয়তমা হিসেবে, স্বপ্ন হিসেবে, আবার কখনো ক্ষোভের কারণ হিসেবেও। কবি নারীর প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, একই সঙ্গে প্রকাশ করেছেন বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা, অবহেলার দাহ এবং সম্পর্কের ভেতরে জমে ওঠা অপ্রকাশিত ঘৃণাও। এই দ্বন্দ্বই এই বইয়ের শক্তি— কারণ জীবন নিজেও দ্বন্দ্বে ভরা।
এই কবিতাগুলোতে ব্যক্তিগত প্রেম শুধু ব্যক্তিগত থাকে না; তা ধীরে ধীরে সার্বজনীন হয়ে ওঠে। প্রিয়জনকে পাওয়ার ব্যাকুলতা, হারানোর ভয়, বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত, এবং তবু আবার ভালোবাসতে চাওয়ার দুর্বলতা— এসব অনুভূতি পাঠকের নিজের জীবনের সঙ্গেই কোথাও না কোথাও মিলে যাবে। কবি এখানে নিজেকে আড়াল করেননি; বরং নিজের ভাঙন, নিজের অপরাধবোধ, নিজের ক্ষুদ্রতাকেও কবিতার ভাষা দিয়েছেন।
গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা গদ্যছন্দে লেখা। এই গদ্যছন্দ কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি কবির স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গি। এখানে শব্দগুলো ছন্দের খাঁচায় বন্দি নয়— তারা হাঁটে, থামে, শ্বাস নেয়। কোথাও ভাষা সংযত, কোথাও তা হঠাৎ উগ্র, কোথাও আবার নিঃশব্দে কাঁদে। এই অপ্রথাগত ছন্দই কবিতাগুলোকে আরও ব্যক্তিগত, আরও বাস্তব করে তুলেছে।
বৈরী হাওয়ায় কোনো নিখুঁত প্রেমের গল্প নয়। এখানে কেউ নায়ক নয়, কেউ পুরোপুরি খলও নয়। এখানে মানুষ আছে— ভুলসহ, দুর্বলতাসহ। এই কবিতার বই পাঠ করলে পাঠক হয়তো সব কবিতার সঙ্গে একমত হবেন না, কিন্তু অনুভব করবেন— কারণ এগুলো সাজানো আবেগ নয়, এগুলো জীবনের ভেতর দিয়ে আসা সত্য।
কবির প্রথম প্রকাশিত বই হিসেবে বৈরী হাওয়ায় কোনো ঘোষণা দিতে চায় না, কোনো দাবিও করে না। এটি কেবল নিজের মতো করে কথা বলতে চায়। যদি এই বইয়ের কোনো একটি কবিতাও পাঠকের হৃদয়ের কোনো গোপন কক্ষে হালকা নাড়া দেয়— তাহলেই এই বইয়ের প্রকাশ সার্থক।
এই কবিতাগুলো আসুক পাঠকের কাছে, ঠিক যেমন বৈরী হাওয়া আসে— অপ্রত্যাশিতভাবে, কখনো কষ্ট দিয়ে, কখনো মুক্তি দিয়ে, কিন্তু উপেক্ষা করা যায় না এমন শক্তি নিয়ে।
— বাদল চন্দ্র সূত্রধর
প্রভাষক (ইংরেজি)
খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ,
খাগড়াছড়ি সেনানিবাস।