নাম তার আবু আবদুল্লাহ। এই নামে দেশ বাড়িতে কেউ তাকে চিনবে না। বাবা তার পীর সাহেবের কাছ থেকে এই নাম চেয়ে এনেছিলেন। পর পর পাঁচ বোনের পর তার জন্ম। বাবা-মা যখন পাঁচ পাঁচটা মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে দুঃখ ও হতাশার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন তখন এক ঝলক আলো মুঠো করে আবু আব্দুল্লাহর জন্ম। অভাব অনটনের সংসারে সে আলো বেশি দিন ছড়াতে পারেনি। বাবা জমির আলী তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া দেড় বিঘা ধানি জমি আর ভিটা বাড়ির অংশ নিয়ে জীবন শুরু করে। অবশ্য দুই বোন আর মা'ও তার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। চারজনের সংসার নিয়ে দেড় বিঘার ফসলে বছর পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না। অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাস ছয়েকের সংস্থান হতো। বাকি ছয় মাসের জন্য অন্যের জমিতে জন খাটা। গৃহস্থের কাছ থেকে জমি নিয়ে বর্গা চাষ শুরু করে। লাভ তেমন না হলেও জন খাটতে হতো না। সময় যায়, বয়স বাড়ে। পুষ্য বাড়ে। আরো তিনটা মেয়ে আসে তার সংসারে।
সবশেষে আসে আবু আব্দুল্লাহ। বাবার ইচ্ছা ছিল আবু আব্দুল্লাহকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবে। আবু আব্দুল্লাহর যখন ছয় বছর বাবা জমির আলী তাকে নিয়ে যায় তার পীর সাহেবের কাছে। উনার কাছেই আবু আব্দুল্লাহর হাতে খড়ি। তারপর তাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। বাবা জমির আলী লেখাপড়া জানতেন না। মা জরিনা বিবি মক্তবে কোরআন শিক্ষা করেছে। প্রথম পাঠ আর বাল্যশিক্ষাও তার মুখস্ত ছিল। বোনদেরকে মা'ই কুরআন তালিম দিয়েছে আর বাল্যশিক্ষা পড়িয়েছে। বড় চার মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে দেড় বিঘা সম্পত্তির পুরোটাই বিক্রি করে দিতে হয়েছে। জমির আলীর একমাত্র অবলম্বন বর্গা চাষ। তার পরিশ্রম আর সততার কারণে বর্গা জমি পেতে অসুবিধা হয় না। আবু আব্দুল্লাহ চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। সেও বিভিন্ন উপায়ে সংসারের কাজে লাগে। যেদিন স্কুল বন্ধ থাকে সেদিন এবং অন্যদিনে স্কুলে যাবার আগে গাভিটার যত্ন নেয়। দূর্বা ঘাস কচুরিপানা জাতীয় খাবার সংগ্রহ করে যত্ন নেয়, খাওয়ায়। খালে বিলে মাছ ধরে। বাজারে দুধ নিয়ে বিক্রি করে। চলে যাচ্ছিল দিন। আর একটি মাত্র মেয়ে বাকি। এইটারে পার করতে পারলেই জমির আলির নিস্তার। বিয়ের টাকা সংগ্রহ করতে দিন-রাত খাটে। গৃহস্থের কাছে আবদার অনুনয় করে জমি বাড়িয়ে নেয়। জমিরের বউ জরিনা বিবি বাড়িতে ধান কিনে আনে। ঢেঁকিতে চাল করে বিক্রি করে। ধানের দাম পরিশোধ করে কিছু টাকা লাভ থাকে।