আমাদের লোকজ স্থাপত্যের যে বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে তা আমাদের অনেকেরই জানা নেই; বিশেষ করে বাংলার চিরায়ত কুঁড়েঘর বিষয়ে। লোক-স্থাপত্যের পূর্বশর্তই হচ্ছে সহজলভ্য উপাদান, জলবায়ু বিবেচনা, ব্যবহারের উপযোগিতা এবং স্থানীয় কীর্তি-কৌশল ও তাদের শৈলীর ছাপ। এসব বিষয়ের প্রভাবেই গড়ে ওঠে প্রতিটি অঞ্চল বা দেশের নিজস্ব লোকজ-স্থাপত্য শৈলী। স্থানীয় আবহাওয়া উপযোগী সহজলভ্য উপাদানে তৈরি আমাদের বাংলার কুঁড়েঘর সারা ভারতবর্ষের জন্য হয়েছিল এক অনুপম ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। স্থায়ী ইমারত নির্মাণে বাংলার এ লোকজ-স্থাপত্য শৈলী ব্যাপক ও সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল মুসলিম শাসনামলে। মুসলিম শাসনে বাংলায় প্রাক-মুসলিম যুগে যে-ভারতীয় ক্লাসিকাল রীতিতে স্থাপত্য-চর্চার প্রচলন ছিল, তা হ্রাস পেয়ে এ নতুন অনবদ্য বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য শৈলীর আবির্ভাব ঘটে। বাংলায় মসজিদ ও মন্দির নির্মাণে বাংলাদেশের চিরন্তন লোকজ-স্থাপত্য অর্থাৎ কুঁড়েঘরের হেলানো ছাদ, ছাদের বাঁকানো কার্নিশের ব্যবহার এবং ইটের দেওয়াল আবৃত করতে বাংলার বিখ্যাত টেরাকোটা টাইলের ব্যবহার শুরু হয়। বিশেষ করে ইটের তৈরি মন্দির স্থাপত্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। মোঘল স্থাপত্যেও বাংলার লোকজ স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায় সুদূর আগ্রা, দিল্লি ও লাহোরে। আগ্রার দুর্গে বাংলা মহল, সাতমসজিদ ও দেওয়ানি-আমের বিখ্যাত সিংহাসনে বাংলার কুঁড়েঘরের ছাদের প্রভাব প্রকট হয়ে আছে। ব্রিটিশ শাসনামলে সিভিলিয়ানদের জন্য বাস উপযোগী গৃহের মডেল রূপে বাংলার কুঁড়েঘরের ধরনটিকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। তাদের সেই বসতবাড়ির নাম দেয়া হয় ‘বাংলা’, ‘বাংলো’ বা ‘বাঙ্গালো’। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের নানা অঞ্চলে বসবাসের উপযোগী এই বাংলো হয়ে উঠলো সর্বত আদর্শ সমাধান। এই বাংলোর রূপটি নানা বৈরী আবহাওয়ায় এতটাই কার্যকরী ছিল যে, ব্রিটিশরা ভারত উপ-মহাদেশ ছাড়াও অন্যত্র, বিশেষ করে আফ্রিকায় সম্রাজ্য স্থাপন করলে সেখানেও এই বাংলা বা বাংলো নির্মাণ করেছিল।
মো. শাহিনুর রশীদ এই লোকজ-স্থাপত্যের এক ধরন- মাটির ঘর বা বাড়ি নিয়ে যে কাজটি করেছেন তা এক কথায় অনন্য। তিনি তাঁর বইটিতে মাটির ঘরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, শৈলী, নির্মাণ-কৌশল ইত্যাদি বর্ণনা করতে আমাদের শিক্ষাঙ্গনের প্রচলিত কাঠামো বেছে নিলেও তা সাধারণের জন্য সহজ পাঠ্য ও বোধগম্য করে বর্ণনা করতে সক্ষম হয়েছেন। আমার বিশ্বাস, মো. শাহিনুর রশীদ-এর ‘মাটির বাড়ি: বাংলার স্থাপত্য-ঐতিহ্য’ শীর্ষক গ্রন্থটি বাংলাদেশের লোক-স্থাপত্য বিষয়ের উপর একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এমনটি ভাবার যথার্থ কারণ রয়েছে। এ অঞ্চলের নানান সময়ের স্থাপত্য ইতিহাসের উপর লেখালেখি বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বইপত্র চোখে পড়লেও লোকজ-স্থাপত্যের উপর গুরুত্ব দিয়ে আলাদা কাজ বা উল্লেখযোগ্য বই তেমনটা চোখে পড়ে না। এর বড় কারণ বোধহয় লোকজ-স্থাপত্যের বিষয়ে আমাদের আগ্রহ বা সচেতনতার অভাব। হতে পারে অনেকেই হয়তো স্থায়ী উপকরণে— যেমন ইট পাথরের তৈরি ইমারতকে স্থাপত্য হিসাবে মেনে নিলেও অস্থায়ী উপকরণ মাটি, বাঁশ ও কাঠের তৈরি স্থাপনাকে স্থাপত্য হিসাবে মেনে নিতে বা গুরুত্ব দিতে চাচ্ছেন না। প্রকৃত পক্ষে সারা বিশ্বেই লোকজ স্থাপত্য বা ঠবৎহধপঁষধৎ অৎপযরঃবপঃঁৎব নিয়ে কাজ হলেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ বা উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি। আর তাই শাহিনুরের এই বইটি সেই শূন্যতায় একটি ভালো সংযোজন, এতে কোন সন্দেহ নাই। আমার মতে তিনি এ বিষয়ে একজন পথিকৃতের মতো কাজ করেছেন। ফলে এই বইটি স্থাপত্য শিল্প ও স্থাপত্য ইতিহাসের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠকের কাছে সমভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমি তাঁর এই চমৎকার গবেষণাধর্মী কাজটির জন্য সাধুবাদ ও সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করছি।