দীর্ঘদিন…… দীর্ঘ অনেক দিন সুবোধ একটা বাক্সে বন্দী ছিলো। বর্গাকৃতির বাক্স দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতায় সুবোধকে কখনো অতিক্রম করেনি। অতিক্রম করা তো দূরের কথা বরং আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছে তাকে। উচ্চতায় সুবোধের চেয়ে আধফুট ছোট হওয়ায় মাথা নিচু করে থাকে সুবোধ। ফলে সুবোধের ঘাড়টা তার কাঁধের সাথে প্রায়বসে গিয়েছে, মাথাটা নেমে এসেছে বুকের কাছে।
কিন্তু প্রথমেই এমন ছিলোনা। সুবোধ তখন ছোট। ঠিকঠাক এঁটে গিয়েছিলো একেবারে। সুবোধের কাছে বাক্স তখন বিশাল বিলাসবহুল এক আশ্রয়। মাথার উপরে উঁচু ছাদ। চতুর্পার্শ্বে পোক্ত দেয়াল। বর্গাকার বাক্সের একটা কোণা কেবল ছিদ্রযুক্ত। তা দিয়ে বাতাস আসে, আবছা আলো আসে, আর কোথা থেকে আসে খাবার। কে বা কারা ফুটো দিয়ে খাবার দিয়ে যায় বলতে পারে না সুবোধ। অত খবর জানা নেই তার। কোন মাধ্যম নেই। মাধ্যমও যে থাকতে পারে তেমন বোধও নেই। কেবল ছোট্ট হৃদয় ভর্তি কৌতূহল তার হৃদপিন্ডের ভেতর ধুক ধুক করে, চোখ জুড়ে বিস্ময় চক চক করে। বাক্সের বাইরে মানবিক মানুষের শব্দ, নিঃশ্বাস, বচন কেবল শুনতে পায়। আর একটু বড় হলে ফুটো দিয়ে এদের দেখতেও পায়। তারা ঘর পরিষ্কার করে, ঝাট দেয়, সুবোধের দেখাশোনা করে, নিজেরা একসাথে গল্প করে আর হেসে কুটিকুটি হয়। সুবোধ তখন নির্ঝঞ্ঝাট খায়, ঘুমায়, মল ত্যাগ করে। ঘনকের আরো একটি ফুটো দিয়ে ত্যাগকৃত মল কোথায় চলে যায় বলতে পারে না সুবোধ। ও আসলে কোথায় রয়েছে কি অবস্থায় রয়েছে, ভূমিতে না শূন্যে তাও বলতে পারে না। কেবল খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে আর বড় হচ্ছে। ভালোই কেটে যাচ্ছিলো দিন। বিপত্তি হয়েছে দিন বাড়ার সাথে সাথে। একটু একটু করে আরো বড় হয়েছে সুবোধ। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে আর উচ্চতায়। ঠিক ঘনবস্তুর মত। একদিন অবাক হয়ে সে লক্ষ্য করলো বাক্সটা এখন আর ঠিক এঁটে উঠছে না। স্থানে অস্থানে কেমন চেপ্টে যাচ্ছে। তবু প্রাণপণে নিজেকে সংকীর্ণ করে রেখেছে সুবোধ। তার ক্রমবর্ধমান শরীরখানা বাড়তে বাড়তে অবশেষে কোথায় গিয়ে ঠেকবে সে দুশ্চিন্তায় খাবে না বলেও পণ করেছিলো। কিন্তু না খেয়ে কেমন করে বাঁচা যায় তা ঠিক জানে না সুবোধ।