বাংলা সাহিত্যের ন্যায় পৃথিবীর মোটামুটি সকল সাহিত্যেরই আদি আঙ্গিক হলো কবিতা। বাংলা কবিতার ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরনো। চর্যাপদের সহজিয়াপন্থী বৌদ্ধ কবিদের দ্রোহ থেকে বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের মোহমুগ্ধতা থেকে মঙ্গলকাব্যের দেবীদের প্রতিষ্ঠালাভের আপ্রাণ চেষ্টা, মৈমনসিংহ গীতিকার চৌম্বকস্পর্শী কাহিনি পরিবেশনের রেওয়াজ থেকে কবিগানের খিস্তি খেউড়ের জমজমাট আসর, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতার ব্রিটিশ বন্দনা ও ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনার আকর থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিনির্মাণবাদী চরিত্রায়ণের বজ্রদীপ্ত হুঙ্কার, ভোরের পাখি বিহারীলালের মগ্নচৈতন্যের হাহাকার থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির গুরুগম্ভীর ভাবের মূর্ছনা, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার ‘চির উন্নত মম শির’র অতলস্পর্শী ব্যঞ্জনা থেকে পঞ্চপাণ্ডবদের রবীন্দ্র-বলয় ভাঙার সুকঠিন তপস্যা, জসীম উদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’র রূপাইয়ের বাঁশির মোহিনী সুর থেকে পাকিস্তানবাদী কবিদের স্তূতিমূলক কবিতার জোয়ার, শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান’ থেকে আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’র ‘পরাজিত নই নারী পরাজিত হয় না কবিরা’ বলে আত্মবিশ্বাসী দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, শহীদ কাদরীর ‘রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট’র কুচকাওয়াজ থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘চারিদিকে লাশের গন্ধ’র তীব্র রাষ্ট্রীয় সমালোচনা ইত্যাদি নানা ভাব আত্মস্থ করে বাংলা কবিতার বারবার বাঁকবদল হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘বত্রিশ সিংসনের তেত্রিশটি ভাঁটফুল’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো বিভিন্ন ভাবকে আত্তীকরণ করে নবরসে সিক্ত হয়ে বৈচিত্র্যময়তা সৃজন করেছে। কাব্যামোদী পাঠকের রসতৃষ্ণা নিবৃত্তি করতে পারলে লেখক কৃতার্থ হবেন।