সুদীর্ঘ শীতের রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মধুসূদন ঘুম থেকে জেগে
অসুস্থ পিতার কক্ষে প্রবেশ করল। সে মাঝে মাঝেই রাতে বিছানা ছেড়ে
উঠে মুমূর্ষু পিতাকে দেখতে আসে। তার বেডরুমের পাশের রুমেই তিন
বছর যাবৎ তার বাবা অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছে। অনেক বড়ো বড়ো
ডাক্তার দেখানোর পরও মধুর পিতার অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। তার
আরোগ্য লাভের কোনো সম্ভাবনাও বিন্দুমাত্র দেখা যাচ্ছে না। রবং রোগ
দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিছুদিন পূর্বে তাকে ধরে বিছানা থেকে উঠানো
যেত। এখন একেবারে অচল হয়ে পড়েছে। বিছানায় শুয়েই সবকিছু চলে।
তার কথাবার্তাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মধুর মনে ভীষণ ভয়, হয়তো
যেকোনো মুহূর্তে তার বাবার কোনো একটা কিছু ঘটে যেতে পারে। তাই
রাত্রিতে যখনই ঘুম ভেঙে যায় সাথে সাথেই তার বাবাকে গিয়ে দেখে
আসে। নাকের কাছে হাতটা নিয়ে দেখে ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কি
না? সে আজও সেটাই করল। না, তার শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিকমতোই চলছে। সে
কিছুটা স্বস্তিতে খাটের পাশে থাকা চেয়ারে বসল। ঘুমন্ত পিতা যাতে ঘুম
থেকে জেগে না ওঠে তাই সঙ্গোপনে পা টিপে টিপে রুম থেকে বেরিয়ে
গেল। এরপর নিজের রুমে ঢুকে আলনা থেকে শাল চাদরটা গায়ে দিয়ে
সামনের গেটের দিকে অগ্রসর হলো। গেট খুলতেই থামকে দাঁড়াল। বিশাল
গেরুয়াবসনধারী এক সন্ন্যাসী নিবিষ্ট মনে গভীর ধ্যানে মগ্ন। লম্বা লম্বা
জটাধারী চুল তার পিঁছনে ঝুলছে। মধুর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
হয়তো সে এই সন্ন্যাসীর ধ্যান ভাঙিয়ে দিয়েছে। কোন দিশা না পেয়ে মধু
করজোড়ে সন্ন্যাসীর পেছন দিয়ে দৌড়ে গিয়ে তার ডান হাতের পাশে গিয়ে
মাথা নিচু করে তাকে প্রণাম করে ভীত কণ্ঠে অনুনয় করে বলল, “ক্ষমা
করুন বাবা, ক্ষমা করুন”।