বর্তমান বিশ্বের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাতত্ত্ব আর নিছক একটি মানবিক
শাখা নয়-এটি একটি স্ট্র্যাটেজিক ডিসিপ্লিন, যা শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও সামাজিক
বিন্যাসে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। ভাষার শিকড়, রূপান্তর ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আজ
কেবল একাডেমিক চর্চা নয়-এটি একটি বাস্তব প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য এবং নীতিনির্ধারক পর্যায়ে
কার্যকর একটি জ্ঞানের ক্ষেত্র। এই পরিবর্তনশীল, চ্যালেঞ্জভরা বাস্তবতায় "আধুনিক
ভাষাতত্ত্ব" গ্রন্থটি এক দিকদর্শক আলোকবর্তিকা।
বিশিষ্ট দুই ভাষাতাত্ত্বিক, অধ্যাপক খন্দকার মোবারক আলী ও অধ্যাপিকা লতিফা খাতুন
তাঁদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার নির্যাসকে এই বইয়ের পাতায় তুলে
ধরেছেন-একটি অত্যন্ত সুগঠিত, কাঠামোবদ্ধ ও যুগোপযোগী ফর্মেটে। তাঁদের যৌথ প্রয়াসে
তৈরি এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় ভাষাতত্ত্ব শিক্ষার একটি দুর্লভ সংযোজন, যা প্রাতিষ্ঠানিক
পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণেও হয়ে উঠতে পারে অপরিহাযর্ রেফারেন্স
ম্যাটেরিয়াল। এই বইয়ের কাঠামো ও কনটেন্ট ডিজাইন অত্যন্ত পেশাদারভাবে পরিকল্পিত। মোট আঠারোটি অধ্যায়ে ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ, পরিবর্তন, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপমূলতত্ত্ব, অর্থবিজ্ঞান, উপভাষা, আন্তর্জাতিক ধ্বনিবিজ্ঞান থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও শ্রেণীবিন্যাস পর্যন্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বইটির প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক, অথচ ভাষা ও উদাহরণে রয়েছে এশটি ঘরোয়া পাঠযোগ্যতা-যা এটিকে ছাত্র, গবেষক এবং শিক্ষকদের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে।
বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, লেখকদ্বয়ের ব্যাখ্যানভঙ্গি তথ্যনির্ভর, কিন্তু একঘেয়ে নয়; বরং তা
বিশ্লেষণাত্মক, পরিপূর্ণ এবং ভাষাতত্ত্বের মতো তুলনামূলকভাবে কঠিন একটি বিষয়ের
জটিলতাকে সুশৃঙ্খলভাবে পাঠযোগ্য করে তুলেছে। বইটির অন্তর্ভুক্ত “গ্রন্থপঞ্জী” ও “নির্ঘণ্ট”
অধ্যয়নপ্রবণ পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত হিসেবে কাজ করবে।
"আধুনিক ভাষাতত্ত্ব" কেবল একটি বই নয়-এটি একটি জ্ঞানের নেটওয়ার্ক, যা ভাষাবিজ্ঞানের
বিস্তৃত মানচিত্রে বাংলা ভাষায় পাঠযোগ্য এবং গবেষণাসক্ষম একটি ভিত্তি স্থাপন করেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এটি কেবল পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নয়, বরং গবেষণার সূচনা বিন্দু
হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
আমরা আশা করি, এই গ্রন্থটি বাংলাদেশের ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে
একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। শুভ হোক গ্রন্থটির পথচলা।
- কবি, নির্মলেন্দু গুণ
ঢাকা - বাংলাদেশ।