লেখক জিয়াবুল আলম মানুষের জীবন কোনো সরলরেখা নয়, বরং নাফ নদীর মোহনার মতো এক জটিল আবর্ত। ১৯৯০ সালের এপ্রিলে সাবরাংয়ের তপ্ত বালিতে যখন আমার অস্তিত্বের শুরু, সেদিন থেকেই আমি দেখেছি জীবন আর প্রকৃতির এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। মানুষের লড়াইটা এখানে খুব নগ্ন, খুব আদিম।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের ভেতরের সেই গূঢ় বাস্তবতা আর সমাজের রূঢ় রূপটাকে নিরাসক্তভাবে তুলে ধরতেন। আমি যখন আমার ফেলে আসা গ্রাম কিংবা নাফের পাড়কে দেখি, তখন সেখানে কেবল সৌন্দর্য খুঁজি না; খুঁজি টিকে থাকার সেই কঠিন সংগ্রামকে। একজন মানুষ যখন তার আজন্ম চেনা ভিটে আর ধুলোমাখা মেঠো পথ ছেড়ে শহরের যান্ত্রিক অরণ্যে পাড়ি জমায়, তখন তার ভেতরটা ঠিক কতটা উপড়ে যায়, তা কেবল সেই জানে।
আইন পেশার এই প্রথাগত কাঠামোর ভেতরে বাস করেও আমি টের পাই, আমার ভেতরে এক চিরন্তন বাউল বা এক জেদি কিশোর আজও নাফ নদীর সেই লোনা বাতাসে নিশ্বাস নিতে চায়। সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় দাঁড়িয়ে যখন বিচার আর ন্যায়ের কথা বলি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই চরাঞ্চলের মানুষের মুখ—যাদের কাছে বিচার মানে কেবল দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান আর নদীর ভাঙন থেকে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু বাঁচানো।
এই উপন্যাসে আমি সাহিত্য রচনা করতে বসিনি, বরং এক টুকরো জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করতে চেয়েছি। এখানে যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সুর মিশে আছে, তা কেবল শব্দ নয়—তা এক জনপদের নাড়িছেঁড়া টান। মানুষ হয়তো উন্নতির লোভে বা প্রয়োজনের তাগিদে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, কিন্তু মনের গহীনে সেই সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আর নদীর গর্জন কোনোদিন স্তব্ধ হয় না।
'নাফের পাড়ে কৈশোর' কেবল স্মৃতিকাতরতা নয়, এটি হলো এক হার না মানা অস্তিত্বের লড়াই। নদীর জোয়ার যেমন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়েও আবার নতুন পলি দিয়ে চর জাগিয়ে তোলে, মানুষের জীবনও তেমনি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বারবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নেরই এক নির্মোহ রূপরেখা এই বই।