শাহেদা আলমের এই কাব্যগ্রন্থ সেই অসুখ সময়ের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু দৃঢ় উচ্চারণ। এখানে শব্দের চাকচিক্য নেই; আছে হৃদয়ের সরলতা ও ভাষা। আছে একজন নারীর দীর্ঘ জীবনঅভিজ্ঞতার পরিশ্রুত বোধ, যে দেখেছে সংসার, দেখেছে সমাজ, দেখেছে রাষ্ট্রের উপেক্ষা, এবং শেষ পর্যন্ত কলমকে নিয়েছে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য।
এই বইয়ের কবিতায় নানান গন্ধ ছড়িয়ে আছে—রাজনৈতিক নির্মমতা, ভাঙা ভালোবাসার গোপন ব্যথা, শৈশবের স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিমান, নারী নিপীড়নের নির্মম বাস্তবতা, পথশিশুর ক্ষুধা, আবার একই সঙ্গে প্রকৃতির নির্মল ভোর, বৃষ্টির ধুয়ে দেওয়া সকাল, একাকী ভালোবাসার নরম আকাঙ্ক্ষা।
কবি সৌন্দর্যের ভক্ত, কিন্তু অন্ধ নন। তিনি জানেন, ফুলের সুবাস যেমন সত্য, তেমনি রক্তের গন্ধও সত্য। তাই ‘সুখ’-এর মতো কবিতায় তার কণ্ঠ প্রতিবাদী, আপসহীন। সেখানে ভাষা শ্লোগানে পরিণত হয়নি, কিন্তু বিবেককে নাড়া দেয়।
এই গ্রন্থের একটি বিশেষ শক্তি তার সততা। এখানে কৃত্রিম আধুনিকতার আবরণ নেই; নেই শব্দের অযথা কৌশল। আছে বিশ্বাসের স্বচ্ছতা, নৈতিক বোধের দৃঢ়তা এবং মানবিক দায়বদ্ধতা। আজকের ভোগবাদী সময় আমাদের বারবার বলে, “আরো চাই”—এই বই আমাদের মনে ফিরিয়ে দেয় প্রশ্ন, “আমরা কি সত্যিই জানি আমরা কী চাই?”
কবিতা পৃথিবী বদলায় কি না—তা সময় বলবে। কিন্তু কবিতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, আর প্রশ্নই পরিবর্তনের সূচনা।
শাহেদা আলমের এই কাব্যগ্রন্থ সেই প্রশ্নের সাহস যোগায়। অন্ধকারের ভেতর থেকেও একটি নির্মল সকালের প্রত্যাশা জাগিয়ে রাখে। পাঠক যখন এই বই হাতে নেবেন, তখন তিনি শুধু কবিতাই পড়বেন না—তিনি এক জীবনের সংহত অনুভব, এক সময়ের সামাজিক প্রতিচ্ছবি এবং এক নারীর জাগ্রত বিবেকের মুখোমুখি হবেন। এই মুখোমুখি হওয়াটাই এই গ্রন্থের আসল অর্জন।