বাংলা সাহিত্যের কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের মৃত্যুর পর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন সমরেশ চলে যাওয়া মানে এখন বাংলা সাহিত্যে আর কে রইল কথাটা যে মিথ্যা নয়, সমসাময়িক সাহিত্যে দৃষ্টি দিলে তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মৃত্যু কী সহজ, কী নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়- এমনটা লিখে গিয়েছেন সমরেশ মজুমদার। সহজভাবে মৃত্যু তার দরজায় কড়া নেড়েছিল কি না, জানা নেই, তবে বাংলা সাহিত্যের জগৎকে অনাথ করে চলে গেলেন কালবেলার স্রষ্টা।
কত বাঙালির কৈশোরজুড়ে রয়েছেন সমরেশ মজুমদার। কতজনের মনে কৈশোরে অর্জুন হওয়ার সুপ্ত বাসনা জেগেছে। অনিমেষ-মাধবীলতা চরিত্র শিহরণ জাগিয়েছে কত হৃদয়ে। আজ নিজের সৃষ্টিকে রেখে কালপুরুষের দেশে লীন হয়ে গেলেন স্রষ্টা।
জলপাইগুড়ির ছেলে হওয়ায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আলাদা একটা আকর্ষণ ছিল প্রয়াত লেখকের ওপর। তিনি বলেন, আমি শিলিগুড়ির, ও জলপাইগুড়ির। জলপাইগুড়ি জিলা স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছে। নাটক করতে করতেই হঠাৎ করে ও একটা ছোটগল্প লিখল দেশ পত্রিকায়...। যত দূর সম্ভব ওর প্রথম উপন্যাস ছিল দৌড়। আমি বরাবর ওকে বাবলু বলে ডাকতাম। ও বলত, তুমি ছাড়া আর কেউ আমাকে বাবলু বলে ডাকার নেই।
সমরেশ মজুমদারের জনপ্রিয়তা দেখে অনেক সময়ই ঈর্ষা হতো শীর্ষেন্দুর, প্রকাশ্যে সে কথা জানিয়েও ছিলেন অনুজ লেখককে। বরাবর সেসব কথা হেসে উড়িয়ে দিতেন সমরেশ মজুমদার।
ষাটের দশকের উত্তাল বাম রাজনীতির প্রভাব সমরেশ মজুমদারের লেখায় পাওয়া যায়। বৈশ্বিকভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের যে ধারা তার দ্বারা প্রভাবিত হন তিনি। নকশাল বাড়ি আন্দোলনও তার লেখালেখিতে বড় অংশ জুড়ে ছিল। যদিও এদিক থেকে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আলাদা।
সত্যসন্ধানী অর্জুন এর স্রষ্টার প্রয়াণ মেনে নিতে পারেননি আরেক কথাসাহিত্যিক শংকর। তিনি বললেন, লেখক হিসেবে ও জনপ্রিয় হওয়ার আগে থেকেই আমি ওকে চিনতাম। কারণ, স্কটিশচার্চ কলেজে আমার ভাইয়ের সহপাঠী ছিল সমরেশ। এই প্রসঙ্গেই তিনি আরও বললেন, নিয়মিত যোগাযোগ ছিল আমাদের। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখাও হতো। একটাই কথা বলতে চাই, ওর মতো ছেলে আমি খুব কমই দেখেছি। ওর চলে যাওয়াটা আমার কাছে ব্যক্তিগত শোক।
দুই.
বাংলা সাহিত্যের এ তিন কথাসাহিত্যিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল আমার। সেই সাক্ষাৎগুলো অবশ্য সংক্ষিপ্ত পরিসরে। কিন্তু ব্যাপ্তিটা ব্যাপক। একটা ভিন্ন স্বাদ ও গন্ধ আছে। তাদের মধ্যে একটা ঈর্ষা ব্যাপার ছিল, কিন্তু সেটাকে তারা উতরে গেছেন, সম্পর্কটাকে তারা বিনয়ী করেছেন, অক্ষুণ্ন রেখেছেন। ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাদের সঙ্গে আলাপে যে কথাগুলো উঠে এসেছে, সেগুলোই এখন মলাটবন্দী করার একটা চেষ্টা করা হয়েছে। হয়তো তাদের কথাগুলো বিভিন্ন সময়ে উচ্চারিত হয়েছে, তার ভেতরে নতুন কিছু আবিষ্কার করাটা বোকামি হবে। কালের চক্রে মানুষ পাল্টায়। কাল বাসময়বোধ মানুষকে গভীর ও গভীরতম সীমাহীন কোনো নির্মাণের দিকে নির্দেশ করে। সময় কখনো কারোর দাসত্ব করে না। কিন্তু মানুষ সময় নিংড়ে নিজেকে ক্রমাগত অবস্থান্তরেই খুঁজে পায়। সেই সময়েই দাঁড়িয়ে কোনো লেখক তার লেখায় সমাজজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। এই যুগযন্ত্রণার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শংকর ও সমরেশ মজুমদার সরব সাক্ষী। তাদের সমসাময়িক কালে এ কারণে আরও প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই তাদের লেখা জীবনবোধে দীপ্ত। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ যে কতটা বিপন্ন, আর তা থেকে স্বস্তি সন্ধানে সঞ্জীবনী মন্ত্র হয়ে দাঁড়ায় তাদের সাহিত্য।