যে শতাব্দী মানুষের হাতে একদিকে অভূতপূর্ব প্রযুক্তির প্রদীপ তুলে দিয়েছে, অন্যদিকে তার আত্মার ভেতরে গোপনে অন্ধকারের বিস্তার ঘটিয়েছে, সেই একবিংশ শতাব্দীকে বোঝা সহজ নয়। এ সময়কে কেবল তথ্য দিয়ে ধরা যায় না, কেবল পরিসংখ্যান দিয়েও নয়; একে বুঝতে হয় বিবেক, বোধ, ইতিহাসচেতনা এবং মানবিক দূরদৃষ্টির সম্মিলিত আলোয়। নূরে আলম সিদ্দিকীর একবিংশ শতাব্দীর ভাবনা সেই দুরূহ কাজটিই অসাধারণ সংবেদনশীলতা ও বিশ্লেষণী শক্তির সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। এটি নিছক একটি প্রবন্ধের বই নয়; এটি আমাদের সময়ের মর্মরোগ শনাক্ত করার এক সাহসী বৌদ্ধিক অভিযান।
এই গ্রন্থের বিশেষত্ব এই যে, এখানে লেখক সমকালকে কেবল দেখেননি, তিনি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সভ্যতার গতিপথ নিয়ে, উন্নয়নের অন্তঃসার নিয়ে, অর্থনীতির নৈতিকতা নিয়ে, শিক্ষার অবক্ষয় নিয়ে, প্রযুক্তিনির্ভর মানবজীবনের অস্থিরতা নিয়ে, পরিবেশের বিপর্যয় নিয়ে, এবং সর্বোপরি মানুষের ভেতরকার মানুষটি কতখানি বেঁচে আছে— সেই মৌলিক প্রশ্ন নিয়েও। ফলে বইটি পাঠকের সামনে শুধু ঘটনার সারি সাজায় না; বরং তাকে বাধ্য করে নিজেকে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে এবং বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন চোখে দেখতে।
সূচিপত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই বইয়ের চিন্তার পরিধি কত বিস্তৃত। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ, অর্থনৈতিক ন্যায়, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা-সংকট, প্রযুক্তির অভিঘাত, সামাজিক অবক্ষয়, সাম্প্রদায়িকতা, বিশ্বরাজনীতি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ— সবকিছুই এখানে স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রন্থ একটি একক বিষয়ের বয়ান নয়; এটি আমাদের যুগসত্তার বহুমাত্রিক মানচিত্র।
নূরে আলম সিদ্দিকীর লেখার আরেকটি বড় শক্তি হলো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির দ্বৈত গভীরতা। তিনি একদিকে বাস্তবতার কঠিন মাটি স্পর্শ করেন, অন্যদিকে সেই বাস্তবতার নৈতিক তাৎপর্যও অন্বেষণ করেন। তাঁর বাক্য আবেগপ্রবণ হলেও আবেগনির্ভর নয়; তাঁর বিশ্লেষণ তীক্ষ্ণ হলেও শুষ্ক নয়; তাঁর উদ্বেগ গভীর হলেও তা নৈরাশ্যে পর্যবসিত হয়নি। বরং তিনি বিশ্বাস করেন— চিন্তার কাজ হচ্ছে হতাশাকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, বিবেককে জাগিয়ে তোলা। সেই কারণে এই বইয়ের প্রতিটি রচনা পাঠকের চেতনায় শুধু আলোড়ন তোলে না, তাকে এক ধরনের দায়িত্ববোধের দিকেও আহ্বান জানায়।
এই বইয়ের নাম একবিংশ শতাব্দীর ভাবনা— কিন্তু এর ভেতরে আছে কেবল শতাব্দী-চিন্তা নয়, আছে মানবভাগ্যের উৎকণ্ঠা, সভ্যতার আত্মসমালোচনা এবং উত্তরণের প্রত্যাশা। লেখকের ভূমিকাতেও যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে— পাঠক যেন আরও যুক্তিবাদী, আরও মানবিক এবং সমকাল-সচেতন হয়ে ওঠেন— এই গ্রন্থ তারই এক প্রাণবান বহিঃপ্রকাশ।
বাংলা প্রাবন্ধিক সাহিত্যে এমন বইয়ের প্রয়োজন সব সময়েই ছিল, এখন আরও বেশি। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন শব্দের প্রাচুর্য আছে, কিন্তু গভীর চিন্তার অভাব; মতের কোলাহল আছে, কিন্তু বিবেকের স্বর ক্ষীণ। সেই প্রেক্ষাপটে একবিংশ শতাব্দীর ভাবনা এক মূল্যবান সংযোজন— কারণ এটি পাঠককে তুষ্ট করে না, তাকে জাগায়; তাকে আরাম দেয় না, তাকে ভাবায়; তাকে কেবল জানায় না, তাকে ভেতর থেকে নেড়ে দেয়।
এই বই তাই শুধু পড়ার জন্য নয়, ফিরে ফিরে ভাবার জন্য; শুধু সমকাল বোঝার জন্য নয়, নিজেকে বুঝবার জন্যও। যে পাঠক সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চান না, বরং সময়কে বুঝে তাকে অতিক্রম করতে চান— তাঁর হাতে এই বই এক উজ্জ্বল সহচর হয়ে থাকবে।