একটি নাট্যদল একটি ইতিহাস...
অত্যন্ত প্রীত হবার বিষয় যে গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়ের অর্ধশত বছর পূর্তি হলো। এই সুবর্ণ জয়ন্তীর শুভলগ্নে গণায়ন বৃত্তান্ত প্রকাশিত হয়েছে। একাত্তরের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা একদল তরুণের ছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী সমাজে সমতা আনার কাঙ্ক্ষাও ছিল। এ প্রেক্ষাপটে ‘নাটকের শিল্পিত চেতনায় জীবন সত্য প্রকাশে প্রত্যয়ী আমরা’ এ মিশন ও ভিশন নিয়ে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে সংকটময় সময়ে ১৯৭৫ সালে গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করেছে।
গণায়ন বাংলাদেশের প্রথম নাটক ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ মঞ্চস্থ করেছে। এটা একটা মাইলস্টোন। এরই ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘অবশেষে জেনারেল’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে দর্শক-শ্রমিক জনতা গণায়নকে আর্টিজান ও পার্টিজানের উষ্ণীষ পরিয়ে দিয়েছে। ‘শেষের রাত্রি’ দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে চট্টগ্রামে প্রথম মঞ্চে আনে গণায়ন। তাছাড়া গণায়ন ইউরোপ, গ্রিক, জর্মন, ফরাসী, মিশরের নাটকের অনুবাদ, রূপান্তর, মঞ্চায়ন করে বৈশ্বিক নাটককে দর্শকের সামনে পেশ করেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সূচনায় গণায়নের অর্ধডজন সদস্য শিক্ষাবিদ হিসেবে যুক্ত হয়ে অবদান রেখেছেন। গণায়ন থেকে বের হয়েও পারফর্মিং আর্টের বিভিন্ন শাখায় দেশে-বিদেশে খ্যাত হয়েছেন অনেক গণায়নজন। গণায়নের সভ্যগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানও বয়ে এনেছেন।
নগরে-বন্দরে দিবসে-নিশিথে গণায়নের নাটকের সংলাপ তরুণদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। আমরা যখন বলি, ‘নাটক হচ্ছে শিল্পের সোভিয়েত’ অথবা ‘নাটকের মঞ্চ পল্টনের মাঠের চাইতেও সরব’ আর তখনই তা গ্রাফিথি হিসেবে দেয়ালে খোদিত হয়ে গেছে। গণায়নের পত্রিকা, গ্রন্থ প্রকাশনায় সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলন। গণায়ন বৃত্তান্ত শুধু গ্রন্থ নয়, এটা শুধু নাটক নয়, সম্মিলিত সংস্কৃতির একটা ইতিহাস।
তীব্র বৈষয়িক সমাজে পঞ্চাশটি বছর গণায়নের সাথে থাকা একটি অত্যাশ্চর্যের বিষয়। এটা একটা নিখিল জীবন কাটিয়ে দেয়া। এর মধ্যে অনেক সতীর্থ প্রয়াত হয়েছেন। তাদের রুহের মাগফিরাত ও আত্মার সদগতি কামনা করছি। সৃষ্টির পর থেকে ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি জেনারেশন গণায়নের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন। তাদের জন্য সুবর্ণজয়ন্তীতে টুপি খোলা অভিনন্দন। অত্যন্ত প্রীত হবার বিষয় যে ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে গণায়ন সপ্তাহব্যাপী যে নাট্য উৎসব করলো, তার সচিত্র ডকুমেন্টেশনসহ একটি অ্যালবাম সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। এতে গণায়ন বৃত্তান্ত গ্রন্থটি পূর্ণতা পেয়েছে।
গণায়ন বৃত্তান্ত-এর সম্পাদনায় সহযোগী হিসেবে ডা. মনোতোষ ধর ও অধ্যাপক ম. সাইফুল আলম চৌধুরী প্রচুর শ্রম দিয়েছেন। মূলত গণায়নের পুরো টিমই এর সাথে জড়িত ছিলেন। যারা লিখেছেন, যারা শ্রম দিয়েছেন তারা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার অপেক্ষা রাখে না। ৬০০ গ্রেডের উচ্চশক্তি সম্পন্ন রড উৎপাদক জিপিএইচ ইস্পাতের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
গণায়ন বৃত্তান্তের প্রচ্ছদ করে করোনায় অকাল প্রয়াত হয়েছেন বন্ধুশ্রেষ্ঠ চিত্রকর খালিদ আহসান। তাঁর জন্য অবিরল অশ্রুধারা ও দোয়া রইল।
অনিবার্যভাবে খড়িমাটি প্রকাশক ও তরুণ বন্ধু কবি মনিরুল মনিরের জন্য কৃতজ্ঞতা।
গণায়নের সুবর্ণজয়ন্তী সফল হয়েছে।
পরম আমাদের সহায় হোন।
অভীক ওসমান
..............................................
‘নাটকের শিল্পিত চেতনায় জীবন সত্য প্রকাশে প্রত্যয়ী আমরা’ এ স্লোগান নিয়ে ১৯৭৫ সালে ‘গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়’ আত্মপ্রকাশ করেছে। স্বাধীন দেশের থিয়েটার আন্দোলনের রূপকল্প সাজতে সাজতে এই সম্প্রদায়ের যাত্রা। উত্থাল সময়ে শিল্প-সুস্থ প্রবেশকের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রথম পথনাটক ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ মঞ্চস্থ করেছে। এটি এক বাঁক বদলের সময়। পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘অবশেষে জেনারেল’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে দর্শক-চিন্তক-শ্রমজীবী মানুষের কাছে আপন হয়ে ওঠে। এরপর একে একে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘শেষের রাত্রি’ দিয়ে এগোতে থাকে। তাও বাংলাদেশে প্রথম। গণায়ন নানাপদের নাট্য-সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে ভাবতে ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে।
এরপর গ্রিক, জর্মন, ফরাসী, মিশরসহ বহু বিদেশি নাটকের অনুবাদ-রূপান্তর-মঞ্চায়ন করে বাংলাদেশের নাটককে বিশ্ব-সংস্কৃতি সম্ভারে তুলে দেয়। নানা পারফর্মিং আর্টের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অংশ নেন বহু গুণী নাট্যজন। যাঁরা পরবর্তীতে দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
নাটকের ইতিহাসে তীব্রতর হয়ে পড়ে এই নাট্য সম্প্রদায়। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের নাট্যভ্রমণে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেছে। অনেকেই এই সম্প্রদায়ের সাথে পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন। আজো চালিয়ে যাচ্ছেন শক্তি-সামর্থ্যরে অমোঘ ও স্বতন্ত্র শ্রম দিয়ে। সময়ের সাথে সাথে এই বই রচিত হয়ে উঠলো মঙ্গলের বৃত্তান্ত নিয়ে। যাকে ইতিহাসরূপে উপভোগ্য করে তুলবে বলতে পারেন। প্রকৃত অর্থে এই বই দলিলরূপেই সকলের কাছে থেকে যাবে। সম্পাদনা করেছেন নাট্যকার অভীক ওসমান।
গণায়ন বৃত্তান্ত (১৯৭৫-২০২৫) প্রিয়-অনুভূতির মায়াময়-স্পর্শ পাঠকের কাছে থাকবে।
মনিরুল মনির
কবি