চাকচিক্যময় পৃথিবীতে সে তত বেশি অগ্রসর যে যত বেশি আনুষ্ঠানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক| কোন সত্যই সত্য হয়ে উঠে না যতক্ষণ না সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়| যতক্ষণ না সামাজিক গণমাধ্যমে প্রচার হয়| বিয়ের অনুষ্ঠান, বিবাহবার্ষিকী সবকিছুরই আজ আনুষ্ঠানিকতা চাই| না হলে সত্য যে চাপা পড়ে যায়| কার জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান কতটা জাকজমকপূর্ণ ছিল, কতজন উপস্থিত হয়েছিল, কতগুলো উপহার এসেছিল, কতটা ছবি পোস্ট করা হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কতটা লাইক পড়েছে এসব মিলিয়ে একটা জন্মদিন তাৎপর্যবহ হয়ে উঠে| সেদিন তত বেশি অর্থবহ ও সত্য হয় যে দিনের আনুষ্ঠানিকতা যত বেশি| যদি কারও জীবনে এর উলটো ঘটনা ঘটে, যদি কারও জীবনের জন্মদিনের কোন হিসেব না মিলে নিজের অজান্তে এক বছর ফিরে আসে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে, অর্থহীনভাবে, হিসেব করতে গিয়ে চোখের কোণে বয়ে আসে অশ্রু, নিজের অজান্তে টুপটুপ করে ঝরতে থাকে অঝোর ধারার বৃষ্টি| আবার পরক্ষণেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়| সে জন্মবার্ষিকীটা কি তবে মিথ্যা? কেনই বা তবে এ জন্ম? বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বেলাব শাখার অফিস কক্ষে প্রতিদিনকার মতো যথা নিয়মে সালিশ চলছে| মেয়ের জবানবন্দিতে উঠে আসে জামিলার (কল্পিতনাম) তিন বছরের সংসার, একদিনও সে ¯^ামীর আদর ভালোবাসা পাইনি এমনকি সে বুঝেই না ভালোবাসা কি? স্ত্রীর মর্যাদা তো দূরের কথা ভালোভাবে দুমুঠো ভাত, পরনের কাপড় পর্যন্ত পাইনি| তিন বছরের মধ্যে জামিলার কোল আলো করে আসে দুই মেয়ে| সে এমনই এক আলো, যে আলো রাস্তা দেখায় না| চারদিক সে অন্ধকার দেখে| প্রথম মেয়ে হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন| জামিলার বাবার বাড়ি গরিব বলে সে অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করেই সংসার করতেছিল| এর মাঝে গর্ভে আসে দ্বিতীয় সন্তান| যে সময়ের একজন মায়ের যত্ন পাওয়ার কথা সে সময়ে জামিলার উপর নির্যাতন দ্বিগুণ বেড়ে যায়| সহ্য করতে না পেরে চলে আসে গরিব বাবার সংসারে| কিছুদিন যেতে না যেতেই টানাপোড়নের সংসারে মা মেয়ের সাথে যুক্ত হলো দ্বিতীয় মেয়ে| হাসপাতাল থেকে শুরু করে ঔষধ, খাবার, সবই যখন এসে পড়ে সাত সদস্য বিশিষ্ট সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এক রিকশাচালক বাবার উপর, তখন সেই বাবার দীর্ঘশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসা না বলা কান্না যে কোনো মানুষের বুঝার কথা, সে কথা আর নাই বললাম| জামিলার দুই মেয়ে রুনা আর মুনা টুকটুকে দুটি ফুলের মতো মেয়ে| প্রথম মেয়েকে বাবা কখন শেষ দেখেছিল জানা নেই, আর দ্বিতীয় মেয়ে গর্ভে আসার পর থেকেই জামিলা বাবার বাড়িতে| এর ভেতর অনেকবার চেষ্টা করেও তার ¯^ামীর সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারেনি| ভালোই আছে বাবা নামক দুই পায়ী জন্তুটি, সে আজ দিব্যি চলছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে আর নির্ঘুম করে রাখছে আর একটি সংসারের সাত জোড়া চোখকে|