কবি হিসেবে তখন প্রতিষ্ঠিত, ঔপন্যাসিক শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের আবির্ভাব আজ থেকে প্রায় চব্বিশ বছর আগে, শারদীয় দেশ পত্রিকায় ‘সহবাস’ নামের এক সর্বস্তরে আলোড়ন-জাগানো কাহিনির মধ্যে দিয়ে। আলোড়ন— কেননা, সে-উপন্যাসের বিষয়টাই ছিল দুঃসাহসিক। ওয়াইফ-সোয়াপিং বা স্ত্রী বদল নিয়ে লেখা। সেই প্রথম উপন্যাসই জানিয়ে দিয়েছিল যে, গতানুগতিকতার গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে গদ্যের কলম তুলে নেননি এই কবি। যথার্থই আধুনিক তাঁর বিষয়, সব দিক থেকেই স্বতন্ত্র তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। প্রথম উপন্যাসে আভাসিত নিজের সেই ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে একটুও সরিয়ে আনেননি শরৎকুমার। এরপর ছ-ছটি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। প্রতিটি উপন্যাসেই বেছে নিয়েছেন বিচিত্র একেকটি বিষয়, ভিন্ন-ভিন্ন একেকটি পটভূমি, উপস্থাপনার স্বমহিম একেকটি কৌশল। কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও-বা রূপকধর্মী এইসব কাহিনির বিস্তারে এক অনন্য সম্মোহন, চরিত্রনির্মাণে এক অনুপম কুশলতা। এবং মর্মমূলে এই অস্থির সময়, এই অসহায় সমাজ, পুরনো আর পরিবর্তমান মূল্যবোধের দোটানায় বিক্ষত, বিপন্ন ব্যক্তিমানুষের অন্তরঙ্গ প্রতিচিত্রণ।শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের সেই সমূহ উপন্যাস নিয়েই এক খণ্ডের এই উপন্যাস সমগ্র। সহবাস ছাড়াও এখানে রয়েছে আশ্রয়-বহুতল বাড়ির পটভূমিকায় লেখা যে-উপন্যাসটি দেশ পত্রিকারই আরেক শারদ সংখ্যায় বেরিয়েছিল। রয়েছে আত্মজৈবনিক উপাদানে সমৃদ্ধ কথা ছিল এবং রেলকামরার যাত্রীরা। সম্পূর্ণ ভিন্ন পটভূমির যে-দুটি উপন্যাসের একটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায়, অন্যটি এক অধুনালুপ্ত পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায়। রয়েছে সৌতি উবাচ, সঞ্জয় উবাচ-কলকাতার এখনকার জীবনযাপন নিয়ে এক নিরুপম রূপককাহিনি। রয়েছে চারপাই ভাই ভাই—জর্জ অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্ম-এর ধাঁচে এক মৌলিক অনুসৃষ্টি। আর রয়েছে মধুর প্রেমের এক ব্যতিক্রমী উপন্যাস— নাশপাতির গন্ধ। সাতটি উপন্যাস। সব মিলিয়ে যেন সাতরঙা এক রামধনু— প্রতিটি রঙই যেখানে আলাদা।
১৯৩১ সালে পুরী শহরে জন্ম কবি Sharotkumar Mukhopaddhay-এর। সাহিত্যচর্চা শুরু করেন কবিতা দিয়ে। কবিতার পাশাপাশি বাংলা গদ্য সাহিত্যেও রয়েছে তাঁর বিশেষ অবদান গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে তুমুল হই চই ফেলে দেওয়া কৃত্তিবাস পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। উচ্চতর শিক্ষা বিদেশে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বড়ো-বড়ো পদে চাকরি করার পর ৫২ বছর বয়সে নিয়েছেন স্বেচ্ছাঅবসর। বর্তমানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেছেন লেখালেখিতে। কবিতার জন্য এবছরই পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কবিতার সূত্রেই পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছেন কবি শরৎকুমার। লেখকের বোহেমিয়ান জীবনে রচিত কবিতার প্রথম লাইন, ‘রাত বারোটার পর কলকাতা শাসন করে চারজন যুবক। এই জনপ্রিয় লাইনের অনুষঙ্গ ধরেই তাঁর বোহেমিয়ান জীবনে লেখা অসামান্য গদ্যগুলির নামকরণ করা হয়েছে কলকাতা শাসনের জার্নাল'। লেখকের নিজস্ব ভাষায়, “পাঁচ ছয় বছর অনিয়মিত জীবন যাপন করার পর আমরা একে একে গৃহস্থ হয়েছি। সেই অনিয়মিত জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে কিছু লেখালেখি করেছি পরে। আমার কিছু কবিতা আর এই আলোয় কালোয় রচনা তার মধ্যে পড়ে। সরস ভঙ্গিমায় লেখা গদ্যগুলির মধ্যে কলকাতা শহরের হৃৎস্পন্দন অনুভব করা যায়।